কথাবার্তা‌

খানদানি বিরিয়ানি

সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী
*****************
biriyani1

‘বিরিয়ানি কোর্মা পটলের দোলমা

মিলেমিশে হয়ে যায় প্যারিসের ছেঁচকি’-

ভজহরি মান্নার সেই বিখ্যাত গানের কলির মত বিরিয়ানির সাথে এটা সেটা মিশিয়ে কোন জনপ্রিয় খাবার এখনো তৈরি হয়নি অবশ্য, কারণ বিরিয়ানি নিজেই একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ উপাদেয় ডিশ। বিরিয়ানি খেতে ভালবাসেন না এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আজকাল তো প্রায় একটা trend-ই হয়ে গেছে আনন্দ উৎসবের অনুষ্ঠানে বিরিয়ানি must! অনেকের মত বাংলা তথা ভারতীয় ক্রিকেটের মহারাজ সৌরভ গাঙ্গুলীরও সবচেয়ে পছন্দের খাবার এই বিরিয়ানি। তবে হ্যাঁ, সৃষ্টির আদি থেকে এর বিবর্তন হয়েছে নানাভাবে, দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে এক এক জায়গার বিরিয়ানি এক একটা কারণে সুখ্যাতি অর্জন করেছে,কাজেই বলা যায় এরা সব একে অপরের জ্ঞাতি ভাই। সেই ভাইদের ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া আর ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ গন্ধ নিয়ে বিরিয়ানি অবতারে ভোজন রসিকদের কাছে সমাদৃত তথা পূজিত হওয়ার কাহিনী বেশ চিত্তাকর্ষক।

শুরুটা হয়েছিল পারস্য দেশে, এমনই মনে করা হয়, তার পরে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়া একদল পার্সি ইসলামিক বণিক হাজির হয় দিল্লীর মুঘল সাম্রাজ্যে। ফারসি ‘বিরিয়ান’ বা ‘বেরিয়ান’ শব্দ , যার আক্ষরিক অর্থ খাবার আগে কিছু ভেজে নেওয়া,তা থেকেই বিরিয়ানি শব্দের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন, যেহেতু মাংস রান্না করার আগে ভেজে নেওয়ার রেওয়াজ ছিল এই রেসিপিতে। আবার অনেকের মতে এটা এসেছে ফারসি ‘বিরিঞ্জ’ শব্দ থেকে যার অর্থ ছিল ভাত। যাই হোক নামকরণ নিয়ে অনেক যুদ্ধ হল এবার আসল গল্পে আসি।

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম স্থাপত্য তাজমহল যাঁর নামাঙ্কিত সেই বেগম মুমতাজ মহল আরেকটি কারণে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, সেটা হল মুঘল হেঁশেলে বিরিয়ানির সূত্রপাত এবং সেখান থেকে গোটা ভারতে এর ছড়িয়ে পড়া। একবার হল কি, নিছক কৌতূহল বশে বেগমসাহেবা মুঘল সৈন্য দলের সেনানীদের শরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে ছানবিন করতে আগ্রহী হলেন, যা দেখলেন তাতে তিনি মোটেই খুশি হতে পারলেন না। দুর্বল হাড় জিরজিরে সেনাদের দেখে তাঁর মনে হল পানিপথের মত যুদ্ধ আবার এসে হাজির হলে এরা তো বেঘোরে মরবে! গুপি বাঘা তো যুদ্ধ বন্ধ করে হাল্লার সেনাদের মণ্ডা মেঠাই খাইয়ে চাঙ্গা করেছিল, আর বেগমসাহেবা সটান বাবুর্চিকে তলব করে ফরমান জারি করলেন অবিলম্বে এমন কোন খাবার বানিয়ে সবাইকে খাওয়াতে যা একইসাথে পুষ্টিকর ও সুস্বাদু,আর বলবর্ধক, যাতে সব সৈন্যসামন্ত তাগড়াই চেহারা বানিয়ে ঢাল তরোয়াল নিয়ে রে রে করে ময়দানে নেমে পড়তে পারে। যেমন কথা তেমন কাজ। হয়ত সেই পার্সিদেরই কেউ কেউ তখন বহাল ছিল মুঘল হেঁশেলে, তারাই একটু বেশি মশলাপাতি দিয়ে সুগন্ধি গোশত রেঁধে ফেললেন ভাতের সাথে। তৈরি হয়ে গেল সেকালের শাহী বিরিয়ানি। অচিরেই সেটা মুঘল কিচেনের সীমা ছাড়িয়ে ভূ-ভারতে ছড়িয়ে গেল আর ধন্য ধন্য পড়ে গেল।

এরপর যেখানে এই পদটির উল্লেখযোগ্য modification হয় সেটা হল লক্ষ্নৌ। মুঘল থেকে আওয়াধি সাম্রাজ্য। সুগন্ধি মশলার ব্যবহারে এখানকার খানসামারা তাক লাগিয়ে দিল রীতিমত। তবে এখানেই শেষ না। পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত।

১৮৫৬ সাল,লক্ষ্নৌয়ের নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ লন্ডনের রানীর সাথে সাক্ষাতের প্রত্যাশা নিয়ে ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় এসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতটাই অসুস্থ যে এখানেই পাকাপাকিভাবে থেকে যাওয়াটা মনস্থ করে ফেলেন একপ্রকার। জায়গাটাও ভাল লেগে গেছিল নিঃসন্দেহে।  সম্রাটের সঙ্গে ভৃত্য অমাত্য খানসামা সবাই তো থাকেই,তাতে পরিবেশটা জমজমাটও হয়, কিন্তু মেটিয়াবুরুজে থাকতে শুরু করলেও লক্ষ্নৌয়ের সুখাদ্যের জন্য মন কেমন করা এড়াতে পারলেন না তিনি। এখানেই একটা মিনি লক্ষ্নৌ গড়ে তোলার প্ল্যান করে ফেললেন অগত্যা। বিরিয়ানি রাঁধা হল। আর উল্লেখযোগ্য,বিরিয়ানিতে আলু দেওয়া হল সেই প্রথম। আলু তখন রীতিমত মহার্ঘ্য বস্তু। পর্তুগীজ সাহেবরা সবে সবে এনেছে সেটা এ দেশের বাজারে। রাজবংশীয় মর্যাদাসম্পন্ন ছাড়া সাধারণের নাগালের বাইরে সে জিনিস। অতএব আওয়াধি রান্নাঘরে perfect choice হয়ে গেল আলু। ভাবা যায়!  এখন অবশ্য সেদ্ধ ডিমও দেখতে পাওয়া যায় কলকাতার বেশ কিছু বিরিয়ানি হাউজে। এও একেবারে কলকাত্তাইয়া চীজ। সস্তায় পুষ্টিকর, নয় কি? পরে ইদানীং কালে বেঙ্গালুরুতেও আলু দেওয়া বিরিয়ানি দেখা গেছে অবশ্য, তবে কলকাতারই উত্তরসূরী সেসব।

ওয়াজেদ আলি শাহ এবং বেগম হজরত মহলের বর্তমান উত্তরসূরী মঞ্জিলাত ফতিমার বক্তব্য অনুযায়ী তাঁরা এখনো সেই সাবেক প্রণালী মেনেই চালিয়ে যাচ্ছেন বিরিয়ানি প্রস্তুতি।

বিরিয়ানির প্রধান খুশবুর জন্য দায়ী জাফরান, ছোট এলাচ, জয়িত্রী। এ ছাড়াও অনেকে জায়ফল, লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা প্রভৃতি ব্যবহার করেন। আর লাগে কেশর। ছোট ছোট কেশরের কুচি সুগন্ধের সাথে বিরিয়ানির মায়াবী হলুদাভ বর্ণ নিয়ে আসে নিমেষে।

মাংস সরাসরি চালের মধ্যে দিয়ে রান্না করা আর সেদ্ধ করার পরে চালের ভিতরে দিয়ে বানানোর রীতি অনুসারে কাচ্চি আর পাক্কি এই দুরকম বিরিয়ানি পাওয়া যায়।

কাশ্মীরে একপ্রকার বিরিয়ানি হত যাতে হিং দেবার প্রচলন ছিল। এখন ঐ অঞ্চলে তেহরি বলে বিরিয়ানির মতই এক রকম স্ট্রীট ফুড পাওয়া যায় বটে, তবে খাদ্যরসিকরা একে কুলীন বিরিয়ানির গোত্রে ফেলতে নারাজ।

যেমন পোলাওতেও বিরিয়ানির সাথে অনেক মৌলিক তফাত পাওয়া যায়, মূল তফাত ব্যবহৃত মশলায়।

তারপর আরও কত রকম, ঢাকাই,  সিন্ধী, হায়দারাবাদী, বোম্বাই, মালাবারী, থালেশ্বরী বিরিয়ানি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আবার উপকরণের রকম ফের আর বিশেষত্বের কারণেও বেশ কয়েক রকম বিরিয়ানি দেখতে পাওয়া যায়, যেমন – মাটন বিরিয়ানি, চিকেন বিরিয়ানি, বিফ বিরিয়ানি, এগ বিরিয়ানি, ভেজ বা আলু বিরিয়ানি, ফিশ বিরিয়ানি, চিংড়ি বিরিয়ানি, ডাল বিরিয়ানি ইত্যাদি। আর বেশি বলব না। লেখা বা পড়ার সময়ে খিদে পেয়ে গেলে সমস্যা বড়ই।

তবে এখানে একটা মজার কথা বলি, আজকাল কলকাতা শহরের অলিতে গলিতে এমন কি মফঃস্বলেও ব্যাঙের ছাতার মত পাল্লা দিয়ে গজিয়ে উঠেছে গাদা গাদা ‘বিরিয়ানি সেন্টার’। সেখানে অবিশ্বাস্য রকম কম দামে হুহু করে বিকোচ্ছে খুশবুদার বিরিয়ানি। পথচলতি মানুষও  চেখে দেখছেন সেসবই। যদিও সনাতনী সাবেক বিরিয়ানির সাথে তুলনায় সেসবের গুণমান নিয়ে সন্দেহ আর বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়।

বেশ কিছু মজাও চালু আছে সেসব নিয়ে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘বিরিয়ানি বৃত্তান্ত’ গল্পেও মজার ছলেই মারাত্মক এক ইঙ্গিত রয়েছে এ ধরণের দোকানের বিরিয়ানি সম্বন্ধে। যেখানে সূত্র হিসেবে শুধু বলা হয়েছে বিরিয়ানির দোকানে বিক্রি বাড়ার সাথে সাথেই কিভাবে পাড়ার পেডিগ্রীহীন নেড়িকুকুরগুলো একে একে স্রেফ উধাও হয়ে যাচ্ছিল!

আর একটা খুব শস্তা রসিকতাও চালু আছে বাজারে, বন্ধুমহলে অনেক সময় এমন বন্ধু থাকে যারা পরস্মৈপদী খেতে পারলে আর কিছু চায়না, তবে নিজে কিন্তু কখনো দিলদরিয়া হয়ে খাওয়ানোর ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করেনা। হয়তো তাকে জব্দ করতেই একদিন বলা হল ‘আজ তোকে বিরিয়ানি খাওয়াব।’ তারপর যথারীতি সে তৈরি হয়ে অকুস্থলে হাজির হবার পরেও কোন আয়োজন না দেখে যখন উসখুশ করছে, তখন সেই বন্ধুরা বলে উঠল ‘ওহ এসে গেছিস? তাহলে একটু বোস, মোড়ের চায়ের দোকান থেকে তোর জন্য এক প্যাকেট ‘বিড়ি–আনি’!
জনপ্রিয় এক বলিউডি ছবির এক কৌতুক দৃশ্যে দেখা যায় জনৈক ব্যক্তি অতি শস্তায় বিরিয়ানি খাবার পরমুহূর্তেই গলা দিয়ে কাকের মত কর্কশ স্বর বেরিয়ে আসছে, তখন দোকানদারকে সন্দেহবশত জিজ্ঞেস করায় সে অম্লান বদনে জবাব দেয় বিশ টাকায় ‘কাউয়া বিরিয়ানি’ ছাড়া অন্য কিছু পাবার আশা করাটাই তো মুর্খামি! অতএব কাকের ডাকটা অবশ্যম্ভাবী ফাউ পাওনা।

যাই হোক, অনেক কথা হল, এবার কি ইচ্ছে করছে বলুন তো? চট করে এক প্লেট বিরিয়ানি অর্ডার দিয়ে ফেলবেন নাকি কাছাকাছি রেস্তোরাঁয়?

*********************************************************************
কাছের মানুষ দূরে গেলেন

sb3

১২ই মে,২০১৫। মাত্র দিন সাতেক আগে শেষ করেছি ‘নীল ঘূর্ণি’। বেশ পুরনো উপন্যাস কিন্তু অনেক সময় অনেক পরিচিত লেখাও নানা কারণে পড়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনা।তবে যখনই পড়ি না কেন, সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কোন লেখা একবার শুরু করলে ওনার কলমের তরতরে গতি,সাবলীল অথচ সহজ সরল ভাষা স্বচ্ছন্দে এগিয়ে নিয়ে চলে সূচনা থেকে সমাপ্তির দিকে এক নিশ্বাসে। এটাও সেরকমই ছিল। তবে এক্ষেত্রে নিজে পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম বলে পড়তে পড়তে চরিত্রগুলোর মধ্যে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করে যাচ্ছিলাম,যারা পড়েছেন লেখাটি তাঁরাই বুঝতে পারবেন ঐ বিষয়টা কেমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলোর জীবনে।সুচিত্রা দেবী নিজে বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন, যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে রসায়নে সাম্মানিক স্নাতক,ভাই শ্রী কুণাল বন্দ্যোপাধ্যায় পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক(সৌভাগ্যক্রমে আমার সামান্য কর্মজীবনের প্রথমে অল্প কিছুদিন ওনার সহকর্মী ছিলাম)।বিজ্ঞান আর সাহিত্য যে হাত ধরাধরি করে চলে আসছে বহুদিন ধরে,সেভাবে ভাবলে সুকুমার রায় থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ সান্যাল, হুমায়ুন আহমেদের মত কলমচির সেই ট্র্যাডিশনের আরেক নাম নিঃসন্দেহে সুচিত্রা ভট্টাচার্য।
সেদিনের কথা। রাত ১১টা বেজে গেছে। হঠাৎ আমার এক অতি পরিচিত সাহিত্যজগতের মানুষের ফোন। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত খবরটা শুনছি যখন আমি তো নইই, তিনি নিজেও মনে হয় বিশ্বাস করছিলেন না। বাধ্য হয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়াল করলাম কুণাল স্যারের নাম্বার। খবরটা সত্যি। জনপ্রিয়তার শিখরে থাকতে থাকতেই ইন্দ্রলোকের বাসিন্দা হলেন আমাদের অতি প্রিয় লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য।কিছুক্ষণ সব গুলিয়ে গেছিল, মনের ভিতর কোথাও অদৃশ্য ‘কাচের দেওয়াল’ ভেঙ্গে পড়ার ঝন ঝন, সত্যি এক ভয়াল ‘নীল ঘূর্ণি’ হিমশীতল করে তুলল গ্রীষ্মের রাতটাকেও। ধীরে ধীরে মিডিয়া তে খবরটা প্রচারিত হতে শুরু করল,মাত্র ৬৫ বছর বয়েসে, যখন তিনি সৃষ্টির মধ্যগগনে, ঠিক তখনি আকস্মিক ভাবে মারণ হৃদরোগের শিকার হয়ে উড়ে গেলেন ‘হেমন্তের পাখি’, আমাদের পাঠকদের ‘কাছের মানুষ’।

অনেকে তাঁকে মৈত্রেয়ী দেবী বা আশাপূর্ণা দেবীর মত ‘মহিলা লেখক’ এর উত্তরসুরী বলে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন যেটা সুচিত্রা দেবী সঙ্গত কারণেই বারবার প্রতিবাদ করে এসেছেন।বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এ প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে  তাঁর কলমে, কথায় নয়।একবার তো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত বিশিষ্ট সাহিত্যিককেও তিনি বলতে ছাড়েন নি এ বিষয়ে। আসলে একবার একটা গল্পে একটি পুরুষ চরিত্র এতটাই জীবন্ত  মনে হয়েছিল যে সুনীল বাবু সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য ছদ্মনামে আসলে কোন পুরুষ লেখকেরই কাজ এটা।  এটাই ছিল ওনার লেখার U.S.P। যে চরিত্রকে যখন নির্মাণ করতেন অদ্ভুতভাবে তার মধ্যে, তার মনস্তাত্বিক জগতে প্রবেশ করে যেতেন। ওনার নিজের কথা থেকেই জানা, একেকবার এমনও ঘটেছে, জটিল ঘটনাপ্রবাহ সৃষ্টির সময়ে যখন উপন্যাসের নায়ক বা নায়িকা সঙ্কটে পড়ল, লেখিকা  নিজেও অবসাদে ভুগতে শুরু করলেন, এতটাই যে রীতিমত ওষুধ খেয়ে সুস্থ হতে হত। এই ডেডিকেশন, প্যাশন, নিজের লেখার প্রতি সৎ থাকার একান্ত চেষ্টাই তাঁর প্রত্যেকটা গল্প কে আরও মর্মস্পর্শী করে তোলে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে।
সুচিত্রা ভট্টাচার্য নারীবাদী লেখিকা ছিলেন এভাবে এত সরলভাবে চিহ্নিত করা হয়তো উচিত নয়, তবে তিনি নিজেও স্বীকার করতেন আমাদের সমাজের মেয়েদের অনেক না বলা কথা যা আলোয় আসেনা সেভাবে,নিত্যদিনের লড়াই সংগ্রাম বঞ্চনার ইতিহাস যা তিলে তিলে জমে ওঠে অচেনা আনাচে কানাচে, তাদেরকে বারবার তুলে ধরতে তাঁর কলম ক্লান্ত হতনা। দহনের ঝিলিক, কাছের মানুষের তিতির বা নীল ঘূর্ণির দয়িতার মত নানা বয়েসের নানা পরিস্থিতির মধ্যে বেঁচে থাকা, লড়াই করা, কখনো হেরে যাওয়া মেয়েদের কথা তাঁর সৃষ্টির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে।বাস্তবধর্মী সেসব গল্পে অনেক সময়েই রূপকথার মত সমাপ্তি ঘটেনা।কখনো মিলনান্তক, কখনো বিয়োগান্ত আবার কখনো ‘ওপেন এন্ডেড’ শেষ দেখা যায় তাঁর লেখায়।

একটা বিষয়ের উল্লেখ করা যাক এ প্রসঙ্গে, সুচিত্রা দেবী কিন্তু যা কিছু লিখেছেন তার প্রায় সবটাই নাগরিক জীবনের সুখ দুঃখ টানাপোড়েন ভাঙ্গা গড়ার খেলা আর মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক ও জটিলতাকে কেন্দ্র করে। গ্রামের মানুষ বা তাদের জীবনযাপন এর কথা প্রথম দিকের দু একটা গল্প ছাড়া পাওয়াই যায়না।এ সম্পর্কে একটা মজার ঘটনা আছে, সুচিত্রা দেবীর অনুরাগী পাঠকেরা অনেকেই হয়তো জানেন তা;তবু কথায় কথায় বলি একবার। স্বনামধন্য সাহিত্যিক বিমল কর ‘গল্পপত্র’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করতেন, সুচিত্রা দেবী সে সময়ে একটু একটু করে ছোটগল্প লিখছেন মাঝে দীর্ঘকাল সাংসারিক কারণে লেখালিখি বন্ধ রাখার পর।তো সেই পত্রিকাতেই গ্রামকেন্দ্রিক একটি গল্প লেখার পর সেটি ছাপাও হয় কিন্তু বিমল কর ওনাকে আলাদা করে ডেকে রীতিমত ধমক দিয়ে বলেন আর কখনো যেন নিজের বৃত্তের বাইরে গিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা না করেন, তাতে মেকি হয়ে যায় রচনাটা।শহুরে জীবনে অভ্যস্ত সুচিত্রা গ্রামে থাকা বা সেই মানুষদের সাথে মেশার সুযোগ পান নি, সেকারণেই হয়তো গল্পটায় কৃত্রিমতার ছাপ পেয়েছিলেন অভিজ্ঞ বিমল বাবু। এই মূল্যবান টিপস টাই এরপর সারাজীবনের পাথেয় হয়ে যায় আমাদের প্রিয় লেখিকার। ধীরে ধীরে নিজের লিখনশৈলীতেও সদর্থক বদল এনেছেন নিরলস পরিশ্রম আর নিষ্ঠার মাধ্যমে,বড়দের জন্য লেখার পাশাপাশি ছোটদের জন্যেও লিখে গেছেন সমানতালে। জনপ্রিয় মহিলা গোয়েন্দা চরিত্র মিতিনমাসিও যেন কোথাও গিয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে লেখিকার নিজের সত্বার সাথে মিলে যান, মধ্যবয়স্কা মধ্যবিত্ত মহিলা, স্বামী সন্তান সহ সংসার সামলান আবার জটিল রহস্যের কিনারা করেন নিমেষে।ঠিক যেমন ফেলুদার চরিত্রে অনেক পাঠক খুঁজে পান সত্যজিতের নিজেরই ছায়া।

ব্যক্তিগতভাবে এই অধমের সাথে প্রিয় লেখিকার কখনো সেভাবে কথাবার্তা বা আলোচনার সৌভাগ্য হয়নি এটা যেমন দুর্ভাগ্য, তেমনি এক টুকরো সৌভাগ্যের মুহূর্ত ছিল গত ২০১৫ কলকাতা বইমেলার এক সন্ধ্যা যখন এক আলোচনাসভা শেষে প্রথম ও শেষ বারের মত আলাপ হয় সদাহাস্যময়ী, দৃশ্যতই মিশুকে মানুষের কথা বলা এই মহান লেখিকার সাথে।জীবনের শেষ একটি বছর দুর্ঘটনাজনিত কারণে ডান হাতে আঘাত পেয়ে অনেক যন্ত্রণা ভোগ করেছেন তিনি, তবুও থামান নি লেখালিখি। কলমের বদলে হাতে তুলে নিয়েছেন কম্পিউটার মাউস,বাম হাতে টাইপ করে এক প্রকার অসাধ্য সাধন করেছেন অজস্র মনোগ্রাহী লেখা উপহার দিয়ে।অনেক পাওনা ছিল আমাদের তাঁর কাছে আরও, আমরা পাঠকরা এ ব্যপারে বড় স্বার্থপরের মত কথা বলি হয়ত, আরও আরও বেশী চাহিদা রয়ে যায়,কিন্তু এ আমাদের অসহায়তা ছাড়া কিছুই নয়। বাংলা সাহিত্যের আকাশে যখন একে একে নক্ষত্রের পতন হয়ে চলেছে, আরও অনেক প্রবীণ দিকপালের কলম থেমে আসছে ক্রমে,অভিভাবিকা সুলভ এই লেখিকার অকাল প্রয়াণ আমাদের শূন্য করে দিল।কি জানি হয়তো এই অপূর্ণতার নামই জীবন, ছোটগল্পের সংজ্ঞাটির মত বাংলা সাহিত্যের এই বিশেষ বিভাগের যশস্বী লেখিকার জীবনও যেন ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে, শেষ হইয়াও হইলনা শেষ’-। স্রষ্টা চলে যান, অমর হয়ে থাকে তাঁর আপন সৃষ্টি। প্রার্থনা করি, মুখের অমলিন হাসিটি নিয়ে নিজের সৃষ্ট চরিত্রদের নিয়ে ভাল থাকুন সুচিত্রা ভট্টাচার্য,ভাল থাকুন ‘অন্য’ এক চির ‘বসন্তের’ অমৃতলোকে।

[প্রকাশিতঃ নিরুক্ত পত্রিকা, ২০১৫]

********************************************************************

বর্ণালী
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

স্বপ্নরা নাকি সাদা কালো হয়। এ কথা কোথাও একটা ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম। সত্য মিথ্যা জানিনা।তবে তার বহু আগেই আমি প্রচুর রঙিন স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলাম। রং চেনা আর রঙ পেন্সিল চেনা কোনটা আগে হয়েছে ঠিক খেয়াল নেই তবে গুঁড়ো গুঁড়ো রং হাতে, বিছানার চাদরে, বই খাতা চেয়ার টেবিল আর ধবধবে চুনকাম করা দেওয়ালে মাখামাখি হতে নিজের চোখে দেখেছি আর একলা একলা আশ্চর্য হয়েছি।জন্মদিনে বাবার দেওয়া রঙের বাক্সজুড়ে দু’ডজন টুকরো খুশির ফোয়ারা ছুটল চারদিকে। কিন্তু মনের রঙ তো মাত্র চব্বিশটা নয়। রামধনুর মাথায় উঠে সে রঙিন গ্যাস বেলুন পেড়ে আনে আকাশের নীল ছাদ থেকে অনায়াসে, সাদা কালো পোর্টেবল টিভি স্ক্রিনের ভিতরে সব রং গুলো কিভাবে কল্পনায় জেগে ওঠে সেটা ভেবে অবাক হয়।আবার খুব জোরে দুচোখ টিপে খানিকক্ষণ বন্ধ করে রেখে ঝপ করে চোখ মেললেই সারা দুনিয়াটার উপর স্নিগ্ধ নীলের আস্তরণ দেখে ভারী মজা পায় রোদেলা দিনে।আকাশের রং নীল কেন লেখা থাকে এটা নিয়ে গভীর আপত্তি ছিল আমার।তাহলে মাঝ বিকেলের হলদে আকাশ, হালকা সাঁঝের বেগুনী আকাশ,ভোরের আলোয় লালচে আকাশ,বাদলা দিনের কালচে আকাশ,গুমোট দিনের ঝাপসা আকাশ এগুলো কি রং নয়? মেঘ গুলো সব নির্ঘাত রঙের কারবারী। ওদের থোকা থোকা সাদা ফুলো ফুলো পেটের ভিতর লাল নীল হলুদ সবুজ বেগুনি কমলা সব রং নিয়ে আসে, সকাল বিকেল পসরা সাজায় আর সন্ধ্যে হলে ফুসমন্তরে আবার সাদা কালো দুনিয়ায় ফিরে যায়।পাশের বাড়ির রোহিত আঁকার কম্পিটিশনে গাছের পাতায় লাল রং করে সুন্দর ছবিটার বারোটা বাজিয়ে যখন আঁকার স্যারের বকুনি খেয়ে চুপচাপ জল ঝরাচ্ছিল চোখ থেকে, আমি চুপিচুপি জিজ্ঞেস করেছিলাম ওকে। কেন এমন করলি রে? বলল আমি তো সবুজ এ দেখেছি রে জানিনা কি করে ওটা লাল হয়ে গেল।প্রথমে ভেবেছিলাম রোহিত হয় মিথ্যে বলছে বাঁচার জন্য নয়ত এটা ম্যাজিক। বাড়িতে এসে বাবাকে প্রশ্ন করতেই জানলাম রঙ না চিনতে পারার সেই অদ্ভুত অসুখটার কথা। আসল রঙের বদলে অন্য রং দেখা, কি আশ্চর্য! মানুষদের ও যে কত বিচিত্র রং। কোন অসুখে কেউ ভুল করে সেই সব রং এক লহমায় চিনে নিতে পারে কি?পারলে বেশ হত কিন্তু।রঙ তো অনুভূতিরও। লাল রং টা দেখলেই কেমন একটা ভয় আসে মনে, নীল তেমনি ঠাণ্ডা শান্তির সাথে কি এক অমোঘ নিষিদ্ধতার টান আনে চোখে, সবুজ যেন শুধু প্রাণোচ্ছলতার সমার্থক আর হলুদ নিয়ে আসে কি এক পরিচিত প্রাচীন বিষণ্ণতা।আমাদের জাতীয় পতাকার ত্রিবর্ণও তো রীতিমত ভেবেচিন্তে সাজানো। গৈরিক যেমন শক্তি আর উদারতার প্রতীক,সাদা রং শান্তি,সততা ও পবিত্রতার বার্তা দেয়, সবুজ তেমন গড়ে তোলে বিশ্বস্ততা, উর্বরতা এবং উন্নতির সোপান।এসব অবশ্য বড় হয়ে জানা। সে তো আরও ভয়ানক কথা জানলাম পড়াশুনা করতে গিয়ে যখন শুনলাম এই সাত রঙের দুনিয়ার বাইরে এমন অসংখ্য রঙ আছে যা আমাদের সামান্য চোখে ধরাই পড়েনা।অদৃশ্য সেই সব রঙের আলোয় অন্ধকার কাটেনা আরও অন্ধকার জগতের। যাই হোক, এইসব ভাবনায় উদাসী হয়ে যাবার আগে মনে পড়ছে সেই দিনটার কথা যেদিন প্রথম রঙ খেলা দেখেছিলাম। জ্বর হয়েছিল বলে ঘরে বসেই সেই বাসন্তী সকালে মুঠো মুঠো রঙিন ধুলো উড়তে দেখলাম পথে। অবাক জানলা দিয়ে চেয়ে দেখলাম আমার চেনা মানুষগুলো সব কেমন অচেনা, চেহারায় বদল ঘটলে যে মানুষ গুলোও বদলে যায় দেখেছিলাম সেদিন যখন পাশের বাড়ির রাশভারী জ্যেঠুকেও দেখলাম চলমান রামধনুটির মতন রেকর্ডে বাজা ‘রঙ বরসে’র সাথে তালে তাল মিলিয়ে নাচছেন আর প্রাণ খুলে হাসছেন ছোট ছোট পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে, জ্যেঠিমা চলে যাবার পর সেই প্রথম হাসতে দেখেছিলাম ওনাকে।

[প্রকাশিতঃ মায়াজম ব্লগজিন]

Advertisements