গল্প গাছা

উর্ধপানে চাও
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী
IMG_20170717_005607


সময়ঃ খৃষ্টপূর্ব ১১০০০ (আনুমানিক), স্থানঃ বর্তমান স্পেনের উত্তরে ক্যান্টাব্রিয়া পার্বত্যভূমি অঞ্চল,সান্তিলানা

গিরিমাটির টুকরোটা ঘষে ঘষে অনেকটা ক্ষয়ে ছোট হয়ে এসেছে। আবার অন্য একটা বেছে নিতে হবে। আগুনটাও আর বেশিক্ষণ জ্বলবে বলে মনে হয়না। নিভু নিভু হয়ে এসেছে আলো। কাঠ দিতে হবে আরও। কিন্তু জো ছাড়া আমাদের দলের বাকিরা তো নেই এখন। শিকার সেরে কেউ এখনো ফেরেনি গুহায়। আর জোও ঘুমাচ্ছে তার বাচ্চা দুটোর সাথে ছাইয়ের বিছানায় পাশের সুড়ঙ্গে। একটানা দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে শিরদাঁড়া একটু টনটন করছে। বাঁপায়ের ভাল্লুকের আঁচড়ের ঘা’টাও শুকায়নি পুরো।ব্যথা করছে থেকে থেকেই।তাও চারকোলের শেষ প্রলেপ দেবার পর আধো অন্ধকারে যখন তাকালাম,মনটা এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে গেল।আহ!পেরেছি আমি।বাইসনটা এরকম ভাবেই দাঁড়িয়েছিল ঘাড় বেঁকিয়ে।ওর বলিষ্ঠ পেশিগুলো ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি অবিকল পাথুরে দেওয়ালের গায়ে। আগে আমি শুধু শিকারের ছবি আঁকতাম। পুরোহিত মং এসে মন্ত্র পড়ে দিত, বর্শার ফলা এঁকে দিতাম তার নির্দেশে হরিণ আর বাইসনের সারা গায়ে বিদ্ধ করে। সেসব তো আঁকতেই হবে আমায়। শিকার পাবার জন্য। আমাদের দলে আর কারো হাতে নাকি সেই যাদু দেননি আমাদের দেবতা বাইসন। পুরোহিত বুড়ো মং তাই বলে। হ্যাঁ আমরা বেঁচে আছি এই আরাধ্য জীবের দয়াতেই। নইলে আমাদের মত সামান্য দুপেয়েদের সাধ্য কি অমন বিশাল প্রাণীকে শিকার করার? তিনি নিজে আমাদের উপহার দেন তার দেহ,তাঁর বিপুল মাংস,তাঁর চামড়ায় আমাদের গাত্রাচ্ছাদন হয় শীতে,হরিণ,ছাগলও তাঁরই কৃপায় পাই। কিন্তু আমি আমার এই হাত দিয়ে আরও কিছু করতে চাই। আমার নিজের ছবি,জো,কুরা,এমনকি বুড়ো মং-এর ছবিও এঁকেছি,যখন হরিণ মারার পর হরিণের ছাল গায়ে জড়িয়ে আগুনের চারপাশে মং গোল হয়ে নাচে সেটাও এঁকে রেখেছি এই গুহার ছাদে।এই গুহাতে আমাদের পূর্বপুরুষরাও ছিলেন একসময়ে। তাদের চিহ্ন আঁকা রয়েছে এর দেওয়ালে দেখো।আমি ভাল শিকার করতে পারিনা।বাঁ’পাটা ছোটবেলা থেকেই কমজোরি আমার। দৌড়ানো তো না-ই,জোরে হাঁটতে গেলেও কষ্ট হয়। তাই সেদিন ঝর্ণা থেকে ফেরার সময় ভাল্লুকটার হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পারতাম না,ঠিক সময়ে কুরা তার বর্শাটা ছুঁড়ে ওটাকে না ভাগালে। এখনো জখমটা যন্ত্রণা দিচ্ছে। আঁকাটা শেষ করলাম।এবার একটু শোব। আলোটাও নিভেছে।কিন্তু বাইরে বোধহয় ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে তুমুল। বাজ পড়ছে শব্দ করে। আকাশের দেবতা আজ রুষ্ট। সবাই ঠিকভাবে ফিরে আসলে হয়। গুহার মুখে চকমকির আগুনটা দেখে আসতে হবে নইলে এসব রাতে নেকড়ের পাল বা শিয়াল গুহায় আশ্রয় নিতে পারে। কড় কড় কড়াৎ!একদম গুহার সামনে একটা বাজ পড়ল। সাথে সাথেই হুড়মুড় করে ভারী কিছু গড়িয়ে পড়ার শব্দ। সর্বনাশ!ধ্বস নামছে।জো!জো!চিৎকার করতে করতে এগোই লেংচে লেংচে। সব অন্ধকার এদিকে। গুহার মুখে আগুনটাও নিভে গেছে মনে হয়। আর আরও ভয়ানক যেটা,সম্ভবত বিরাট বড় একটা পাথরের চাঁই ভেঙ্গে পড়েছে একমাত্র প্রবেশপথের মুখ আটকে। কিন্তু জো কোথায়?বাচ্চাগুলো?হঠাৎ চাপা একটা গরগর শব্দ শুনে চকিতে পিছন ফিরলাম। অন্ধকারে দুটো জ্বলন্ত সবুজ বিন্দু এগিয়ে আসছে আমার দিকে। রক্তের আঁশটে গন্ধটা আমার চেতনা অসাড় করে দিল। আন্দাজ করতে পারছি কেন সাড়া পেলাম না জো-এর,আর আমার আসন্ন পরিণতিও স্থির। হাতে ধরা চকমকিদুটো ঠুকলাম শেষবারের মত, সেই আলোতে দেখতে পেলাম বিশালাকার সেই আহত লোমশ ভাল্লুকটা মৃত্যুদূতের মত এগিয়ে আসছে একপা দু’পা করে। লাফ দেবার ঠিক আগের মুহূর্ত,ইস এই ছবিটা এঁকে রাখতে পারলাম না আর..।

সময়ঃ ১৮৬৮ খৃষ্টাব্দ, স্থানঃ পূর্বোক্ত
একটা সামান্য বুনো খরগোশ যে এভাবে দৌড় করাবে তা ভাবতেও পারেনি পেরেস। সান্তিলানার এদিকের পাহাড়ি রাস্তাগুলোয় চড়াই উৎরাই বড্ড বেশি। হাঁফ ধরে গেল দৌড়াতে দৌড়াতে। ভাল শিকারি সে। আর যোগ্য সঙ্গী তার কুকুর মন্টি। কিন্তু সে ব্যাটাই বা কোনদিকে গেল। অন্যদিন এতক্ষণে দিব্যি খরগোশটাকে এক থাবায় মেরে ঘাড় কামড়ে তুলে আনত ল্যাজ নাড়তে নাড়তে।“কেঁউ কেউউউ!”একী!এ তো মন্টির আওয়াজ। তবে কি বিপদে পড়ল কোন সে?হাঁক দিল তার মনিব-‘মন্টি!মন্টি!’ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে কুকুরটা। আওয়াজ অনুসরণ করে ঝোপ জঙ্গলে ঢাকা একটা পাহাড়ি ফাটলের সামনে এসে দাঁড়াল শিকারি মডেস্টো পেরেস। ফাটলের থেকে করুণ মুখটা বের করে ডাকছে আটকে পড়া মন্টি। খরগোশ বাবাজি লাফ দিয়ে পগারপার। এ বেচারা দেখতে না পেয়ে বেকায়দায় ফেঁসেছে।
-‘ওহ মাই বয়। চিন্তা করিস না,তোকে বের করে আনছি এখুনি’। ভাল করে তাকিয়ে দেখা গেল,গত রাতের ঝড়বৃষ্টিতে বড়সড় একটা গাছ উপড়ে এসেছে শিকড়সুদ্ধু। সেটা আছড়ে পড়েছে এই পাহাড়ের গায়ে;তার আঘাতে,বৃষ্টির ধারায় পাথর আলগা হয়ে ধ্বসে গেছে এদিকের অনেকটা। আর ঠিক সেখানেই বেরিয়ে এসেছে যুগযুগান্ত ধরে চাপা পড়ে থাকা একটা দীর্ঘ ফাটলের সূচীমুখ,কিন্তু আগাছা,শ্যাওলা আর আলগা পাথরের আড়ালে মনে হচ্ছে এটা যেন শুধু একটা ফাটল নয়,বড় কোন সুড়ঙ্গ বা গুহামুখ!মন্টিকে বের করে আনতেই সেটা আরও স্পষ্ট হল পেরেসের কাছে। কৌতূহলে একটা গাছের ডাল ভেঙ্গে সেটা দিয়ে আগাছা আর আলগা পাথর একটু সরাতেই দেখা গেল সত্যিই একটা বেশ বড় গুহার মতই ভেতরে। ছোটবড় পাথরের চাঁই জমে রয়েছে প্রচুর। সাবধানে তার মধ্যে দু’পা এগিয়ে একটু উঁকি দিতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ এল নাকে,তাড়াতাড়ি নাকে রুমাল চাপা দিয়ে বেরিয়ে আসতে গিয়ে চোখে পড়ল পাথরের মত হয়ে যাওয়া কিছু হাড়গোড়ের টুকরো। কোন প্রাণীর হাড় বোঝার উপায় নেই তবে এই গুহাটায় যে অনেক রহস্য আছে সেটা মনে হল অভিজ্ঞ শিকারির। ক্যান্টাব্রিয়ার এই অঞ্চলে সে কমদিন হল শিকার করছেনা,এই বিস্তৃত জমি যাঁর  মালিকানাধীন তিনি এই সান্তিলানা থেকে ৩০ কিলোমিটার পূর্বের শহর সান্তাঁদেরের এক ধনী ব্যক্তি, পেশায় আইনজ্ঞ মারসেলিনো স্যাঞ্জ ডি সচুওলা। তাঁর অনুমতি নিয়েই এখানে নিয়মিত মৃগয়া করতে আসে পেরেস। অতএব তাঁকে এই গুহার ব্যপারটা জানানো সবার আগে প্রয়োজন। ফিরেই দেখা করল সে মারসেলিনোর সাথে। বলে রাখা ভাল,তিনি আইন ব্যবসার পাশাপাশি প্রত্নতত্বেরও চর্চা করতেন শখে অল্প স্বল্প। আসলে মারসেলিনো আদতে একজন অনুসন্ধিৎসু মানুষ ছিলেন, ইতিহাস আর উদ্ভিদবিদ্যাতেও যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন তিনি। কিন্তু পেরেসের কাছে সব শুনেও তিনি আমল দিলেন না খুব একটা এ ব্যাপারে। উত্তর স্পেনের এই সব জায়গায় চুনাপাথরের এমন অজস্র গুহা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, আরও উত্তরে রয়েছে ক্যান্টাব্রিয়া সাগর। একটা সামান্য গুহার আবিষ্কার তাই এমন কিছু তাৎপর্যপূর্ণ মনে হলনা তাঁর। মারসেলিনো নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। গুহার ভবিতব্যে আসলে অন্য কিছু লেখা ছিল।

সময়ঃ ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দ, স্থানঃ সান্তিলানা
কিছু লোকজন সাথে নিয়ে মারসেলিনো এসে পৌঁছলেন নিজের এস্টেটের অন্তর্গত সেই গুহাটার সামনে। আশেপাশে ইউক্যালিপটাসের বন। সাথে খননকার্যের উপযোগী যন্ত্রপাতি কিছু। বড্ড নোংরা হয়ে আছে গুহার মুখটা। পেরেসের কাছে শুনলেও এতদিন আসা হয়নি কাজের চাপে। কিন্তু নিজের জমি যখন মাঝেমধ্যে একটু তো না দেখলেও নয়। আগাছা পরিষ্কার হতেই গুহামুখটা বেরিয়ে পড়ল অনেকটা। মাকড়শার জাল সরিয়ে হাতে মোমবাতি আর বেলচা নিয়ে প্রবেশ করলেন গুহায় মারসেলিনো নিজেই। নানা ধরণের হাড়,তাতে খোদাই করা পাথুরে কিছু টুকরো পাওয়া গেল,সাথে কিছু ঝিমুক আর শামুকের খোলাও। আর দেওয়ালের গায়ে দেখতে পেলেন দুর্বোধ্য কিছু কালো কালো রেখার আঁকিবুঁকি,কে জানে কবেকার!পাথর ধ্বসে গুহার প্রবেশপথটা দুর্গম হয়ে আছে বেশ। মাটি-পাথর সরিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে রাস্তা করতে বেগ পেতে হচ্ছিল।‘যা দেখলাম আজকের মত যথেষ্ট। ফিরে চল সবাই, আবার পরে আসা যাবে’।বাড়ি ফিরে  নিজের পাঁচ বছরের একমাত্র মেয়ে মারিয়াকে গল্প শোনাতে লাগলেন গুহা আবিষ্কারের। বয়েসের তুলনায় মেয়ের বুদ্ধি বেশ বেশিই।বড়বড় চোখ করে একমনে সে শুনল সেসব। তারপর বায়না ধরল বাবার সাথে সেও যাবে একদিন ঐ গুহায়। ঘুরে দেখবে সব। বাবা বললেন “দেখেছ মেয়ের কাণ্ড! ভয়ডর কীসসু নেই! আচ্ছা যাবি। অনেক রাত হল। এবার ঘুমো দেখি?’ মারিয়ার স্বপ্নে সেরাতে আসে প্রাচীনকালের অন্ধকার একটা গুহা। তার ভিতর আগুন জ্বেলে বসে আছে একদল গুহামানব। কি করছে তারা?হাতছানি দিয়ে ডাকছে মারিয়াকে!তাই তো। যেতেই হবে ওখানে। ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে ওঠে ছোট্ট মারিয়া।

সময়ঃ ১৮৭৮, স্থানঃ প্যারিস
আদি প্রস্তরযুগের মানুষ ক্রোম্যাগননদের বসবাসের বেশ কিছু স্থান সম্প্রতি আবিষ্কার হয়েছে ইউরোপের কয়েক জায়গায়। প্যারিসে সেই নিয়ে একটা বড় সভা হচ্ছে প্রত্নতাত্বিকদের। মারসেলিনোর বেশ আগ্রহ প্রাচীন প্রত্নতত্বে,তাই গেছেন সেখানে। ক্রোম্যাগননরা হোমো স্যাপিয়েন্সদের একেবারে নিকট জ্ঞাতি। তাদের খুলির আকার আধুনিক মানুষের মতই। মগজও অনেকটাই পরিণত। বেঁচে থাকার নানা উপকরণ নিজেরা পরিশ্রম করেই বানিয়ে ফেলত বা জোগাড় করত। তারা প্রাচীন বর্শার ব্যবহারকে উন্নত করে তীরধনুকে শিকার করতে শিখে গেছিল।হাড় ও পাথরের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে শিকার,রান্না ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ সামলাত। বেশ কয়েকটা গুহায় তাদের বসবাসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখতে দেখতে মারসেলিনোর মনে আবার নাড়া দিয়ে উঠল নিজের এলাকার অন্তর্গত সেই গুহাটার কথা। নাহ!আরও ভাল করে দেখতে হচ্ছে একবার ফিরে গিয়ে। তবে এবার গেলে একাই যাবেন,বেশি লোক লস্করে কাজ নেই। ওতে চাপ বেড়ে যায় বই কমেনা। সকলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা সামলাবেন নাকি গুহায় ঢুকে ছানবিন করবেন!বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বলতে তিনি অবশ্য একটা দারুণ প্রস্তাব দিলেন-‘আমি বলি কি,তুমি বরং মারিয়াকেও নিয়ে যাওনা তোমার সঙ্গে। ওর তো সামনেই গরমের ছুটি স্কুলে। বেচারি একা একা বাড়ি বসে থাকবে?’

সময়ঃ ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দ, স্থানঃ ক্যান্টাব্রিয়া পার্বত্য অঞ্চল, সান্তিলানা
মাত্র ৯বছর বয়েসে ছোট্ট মারিয়ার উৎসাহ দেখলে অবাক হতে হয়। বাবার সাথে সমানতালে ছোট হাতবেলচা নিয়ে মাটি পাথর সরায়,মোমবাতি জ্বালিয়ে এগোতে থাকে গুহার ভেতর। যত ভিতর দিকে এগোনো যায় আস্তে আস্তে পথ পরিষ্কার হতে থাকে।
-‘বাবা দেখেছ ঐ দিকটায় যেন অনেকগুলো রাস্তা আরও চলে গেছে গুহার ভিতর অন্ধকারে!ওদিকে যাওয়া যায়না?’
-‘হুঁ। দেখেছি। কিন্তু এতদিনের পুরনো গুহা। চট করে এতটা ভিতরে যাওয়া ঠিক হবেনা,মা। কাছাকাছি থাকিস। আস্তে আস্তে এগোনোই ভাল’।
একটা বড় ঝিনুকের খোলে লেগে থাকা মাটি পরিষ্কার করে নেড়েচেড়ে সেটা দেখতে দেখতে বলেন মারসেলিনো। খোলার উপরে কিসব আঁচড় কাটা। মারিয়া কিন্তু একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সেই রহস্যময় আঁধারে। কোথায় গেছে ঐ পথ?কোনও আলোর দিকে?

বেশ কয়েক দফা খোঁজাখুঁজির পরও যখন সামান্য কিছু হাড়গোড়,কিছু বিভিন্ন মাপের পাথরখণ্ড ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া গেলনা,মারসেলিনো একটু হতাশই হয়ে পড়ছিলেন। দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। মারিয়ার স্কুল খোলার সময়ও হয়ে এল। ফিরতে হবে।
আজ মারিয়া মনে মনে ঠিক করে রেখেছে গুহার ঐ বাঁকের দিকে সে এগোবেই,আরও গভীরে যাবে। ভয় পাবেনা একটুও। হাতে মোমবাতি থাকবে,আর এবড়ো খেবড়ো পাথুরে পথে চলার জন্য ছোট একটা কাঠের টুকরো,লাঠির মত ব্যবহার করবে সেটা। তাছাড়া বাবা তো রয়েছেই গুহামুখের সামনে। ভয় পেলে একছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে বাবাকে। ব্যস!যেমন ভাবা তেমন কাজ। ধীরে ধীরে বুকে সাহস এনে ছোট্ট মেয়েটা এগোতে থাকল অজানা গুহার গহ্বরে। ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়াল। একসময় এখান দিয়ে কোন নদীর জল বয়ে যেত নিশ্চিত,পরে গতিপথ পরিবর্তন করেছে হয়তো। মাথার উপর ছাদ ঝুলে পড়েছে নিচু হয়ে। চুনাপাথরের গুহায় স্বাভাবিকভাবেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিছু স্ট্যালাক্টাইট,ছাদ থেকে নেমে আসা ছুঁচলো পাথর আর স্ট্যালাগমাইট,গুহার মেঝে ফুঁড়ে আকাশের দিকে ওঠা শলাকা। যত ভিতরে যাচ্ছে ততই অন্ধকার আর নিস্তব্ধ হচ্ছে আশপাশ। নিজের পায়ের শব্দ আর হৃদস্পন্দন ছাড়া কিছুই কানে আসছেনা মারিয়ার। বেশ কয়েক কদম যেতেই রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেল। বামদিকের পথটা ধরল সে। অপ্রশস্ত পথ। বাতাসের আনাগোনাও কম। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে এগোচ্ছে। মোমের আলো পড়ছে পাথুরে ছাদ আর দেওয়ালে। উঁচুনিচু দেওয়ালে তার নিজের ছায়াটা কাঁপতে কাঁপতে এমনভাবে এগোচ্ছে যেন কোন জীবন্ত প্রাণী। কতবার মনে হল দৌড়ে ফিরে যায় বাবার কাছে,কিন্তু না।কি এক অমোঘ টানে চলতে থাকে সে।বারবার রাতে দেখা সেই স্বপ্নটার কথা মনে আসছে তার। এইতো রাস্তাটা হঠাৎ চওড়া হয়ে যাচ্ছে। যেন একটা বড় হলঘরে এসে পড়ছে সে। মাথার উপর বিরাট একটা ছাদ। মোমের শিখা উঁচু করে তুলে ধরে মারিয়া। একী! আধো অন্ধকারে সে ভুল দেখছে নাতো?ছাদে পাথরের গায়ে ওটা কি?শিং বাঁকিয়ে তেড়ে আসছে টকটকে লাল রঙের যেন একটা ষাঁড়!চিৎকার করে ওঠে সে-“মিরা পাপা! বুএইয়েস পিন্তাদোস!”
–“দেখো বাবা!ষাঁড়ের ছবি আঁকা!”
মেয়ের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে পৌঁছল মারসেলিনোর কানে। হাতের কাজ ফেলে রেখে পড়িমরি করে ছুটলেন তিনি সেই আওয়াজ লক্ষ করে। দৌড়ে এসে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়ালেন বিরাট হলঘরটার মধ্যে। কি দেখছেন এটা?স্বপ্ন না সত্যি?চোখ আটকে গেল ছাদজোড়া বিশাল ছবিগুলোর দিকে। একটা নয়,অনেকগুলো। ষাঁড় নয়,বাইসন ওগুলো। মারিয়া ঠিক চিনতে পারেনি তার কারণ অবশ্য আছে। ইউরোপের এই প্রান্তে তো এখন কোন বাইসন পাওয়া যায়না। সাম্প্রতিক অতীতেও শোনা যায়না কোনকালে ছিল বলে। কিন্তু এই ছবিগুলো এতটাই নিখুঁত…হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মত মনে পড়ে গেল,বছরখানেক আগে প্যারিসের সেই প্রদর্শনীতেও বাইসনের হাড়ে খোদাই করা বিভিন্ন সামগ্রী দেখেছিলেন মারসেলিনো,যা সবই আদি প্রস্তর যুগের নিদর্শন। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তাঁর। তারমানে সুদূর অতীতে স্পেনে পাওয়া যেত এই বাইসন। তাহলে নিশ্চয়ই এসব ছবি প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষেরই কীর্তি।
-“নো সন বুএইয়েস!সন বাইসন্তেস!”
ফিসফিস করে স্বগতোক্তির মত বলে উঠলেন মারসেলিনো,মেয়ের হাতটা মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে।
-“এগুলো ষাঁড় নয় রে! বাইসন!”অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে বাবা-মেয়ে লাল-হলুদ-কালো রঙে রাঙ্গানো প্রায় জীবন্ত একপাল প্রাণীর ছবির দিকে,বাইসন ছাড়াও হরিণ,ঘোড়া আর শিকারী মানুষও দেখা যাচ্ছে কয়েকটা ছবিতে। শুধু একটা মামুলি গুহা নয় এটা,এ ঘরের ছাদটা যেন একটা অনাবিষ্কৃত আর্টগ্যালারি।

১৮৮০ খৃষ্টাব্দ, লিসবন
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে প্রত্নতত্ব বিষয়ে এক বিরাট কনফারেন্স হচ্ছে আজ। ‘প্রাগৈতিহাসিক কংগ্রেস ১৮৮০’,দুনিয়ার সেরা গবেষক আর পণ্ডিতরা একজোট হয়েছেন এ বিষয়ে সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও অগ্রগতি সম্বন্ধে পারস্পরিক আলাপ আলোচনা করতে। ইতিমধ্যে সান্তিলানার সেই গুহাচিত্রের রং ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের নানা প্রান্তেই,মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। সত্যিই কি আদিম গুহাবাসী মানুষের মধ্যে লুকানো ছিল এমন মহান শিল্পী?
মারসেলিনো ঐ চমকপ্রদ গুহাচিত্র আবিষ্কারের পর যোগাযোগ করেন তাঁর বহুকালের বন্ধু প্রত্নতত্ববিদ জুয়ান ভেলানভা পেরেরার সাথে।
-‘ভাই তুমি তো এখন মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক,প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতত্বই তোমার গবেষণার বিষয় বলে জানি। বিষয়টার গুরুত্ব সবচেয়ে ভাল তুমিই বুঝবে। আর মনের মধ্যে জমে থাকা সংশয়,প্রশ্নগুলোর নিরসন করতেও তোমাকেই প্রয়োজন’।
পেরেরা সানন্দে রাজী হয়ে গেলেন। সঙ্গে নেওয়া হল মারসেলিনোর পরিচিত এক চিত্রশিল্পীকেও,এ ব্যপারে সে সাহায্য করতে পারে ভেবে। পেরেরাও ছবিগুলো দেখে সহমত হলেন বন্ধুর সাথে, হ্যাঁ এসব পুরাকালের মানুষেরই সৃষ্টি বটে। সাড়া পড়ে যাবে দুনিয়ায় এর কথা জানতে পারলে। সেইমত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করলেন মারসেলিনো বন্ধু পেরেরা আর চিত্রকর ক্যাসাইলার সাহায্যে,যাতে তিনি ঐ গুহার একটি চমৎকার নাম রাখলেন-‘আলতামিরা’;স্প্যানিশে ‘আলতা’মানে উচ্চ,উপরে আর ‘মিরা’বলতে বোঝায় তাকিয়ে থাকা,দেখা। উপরে ছাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন মারসেলিনো প্রথম সেদিন,তাই এমন নাম। তিনি লিখলেন –‘এখানে পাথর আর হাড়ের তৈরি যেসব ব্যবহারিক সামগ্রী বা প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে,আফ্রিকাসহ পৃথিবীর প্রত্যন্ত প্রান্তে এখনো কিছু আদিবাসী সম্প্রদায় ঠিক এধরনের জিনিসই ব্যবহার করে আমরা দেখেছি। আর ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায়,শিল্পী যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন অঙ্কনে,একটানে এতবড় প্রাণীশরীর নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা অনেক অধ্যবসায়ের ফল। এরা মূলত তিনটে রং ব্যবহার করত ছবি আঁকতে। কালো,লাল আর হলদে। কাঠকয়লা দিয়ে কালো রঙের কাজ চালাতে অনেককেই দেখা যায় এখনো,ওরাও করত সেটাই। তবে লোহার আকরিক হেমাটাইটকে যেভাবে লালরং করতে ব্যবহার করেছে তা এক কথায় অনবদ্য। গুহার এবড়োখেবড়ো উঁচুনিচু অংশগুলোকে এরা কাজে লাগিয়েছে ছবিতে ত্রিমাত্রিকতা আনতে। তাছাড়া লালরংটাকে কখনো গাঢ় করে আবার কখনো হালকা গুঁড়োগুঁড়ো করে জল বা কোন তরলের সাথে মিশিয়ে হালকা করেছে হয়তো। হলুদরং করতে সম্ভবত গিরিমাটিকে(অ্যাম্বার) উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছিল এই প্রাচীন শিল্পীরা। আমি ও আমার বন্ধু পেরেরা এবিষয়ে নিশ্চিত যে এসবই আদিম প্রস্তর যুগের নিদর্শন’।
দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে যেখানেই কোন প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতত্বের সম্মেলনের খবর কানে এসে পৌঁছত,প্রফেসর পেরেরা উদ্যোগী হয়ে তাঁদের আবিষ্কারের কথা প্রচার করার জন্য ছুটতে লাগলেন সেখানে। পর্তুগাল,জার্মানি, ফ্রান্স এবং স্পেনেরও কিছু সভা তার মধ্যে ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের এবং আশ্চর্যের বিষয় কোন জায়গা থেকেই খুব আশাপ্রদ সাড়া পাওয়া গেলনা। আসলে ইউরোপের তৎকালীন নাকউঁচু বিজ্ঞানীদের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল,মানবসভ্যতার ভাল এবং উৎকৃষ্ট যা কিছু আছে সব তাঁদেরই অবদান,তাঁদের পূর্বকালে এমন কোন কিছু থাকতেই পারেনা,যা‘শিল্প’তকমা দেওয়ার উপযুক্ত। মারসেলিনো আর পেরেরার বইটা প্রকাশের পর থেকে সাধারণ জনমানসে বেশ একটা কৌতূহল জাগছিল ঠিকই,এমনকি সম্রাট দ্বাদশ আলফনসো অবধি গুহা পরিদর্শনে এসেছিলেন একবার,কিন্তু এব্যাপারে যারা শেষ কথা বলবেন,সেই প্রত্নতাত্বিক বা গবেষকরা ছিলেন অদ্ভুতভাবে নীরব।লিসবনের কনফারেন্সের দিকে তাই অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন দুই বন্ধু। কিন্তু কি ঘটল সেই সভায়?লুইস লরেন্ট গ্যাব্রিয়েল ডি মর্টিলেট আর এমিল কার্তাইলাক নামের দুজন প্রখ্যাত প্রত্নতাত্বিক উপস্থিত সেখানে। সভায় আলতামিরার প্রসঙ্গ উঠতেই যেন বিস্ফোরণ ঘটল এতদিনের নীরবতা ভঙ্গ করে! গ্যাব্রিয়েল সটান দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে কেটে কেটে বললেন–‘লোকে সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য আর কি কি করতে পারে ভাবলে সত্যি অবাক হতে হয়। আমরা বিজ্ঞানীরা সারাজীবনের জ্ঞান-বুদ্ধি খরচ করে,পরিশ্রম করে চেষ্টা করি অজানা কিছু আবিষ্কারের। আর মারসেলিনোর মত বড়লোকরা স্রেফ নিজেদের খেয়ালে পয়সা খরচ করেন মিথ্যাকে সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা করতে। জেনে রাখুন,প্রত্নতত্ব কোন শখের বিষয় নয়’।
এই পর্যন্ত বলা হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর পেরেরা।
-‘কি বলছেন আপনি? এভাবে একটা সৎ প্রচেষ্টাকে হেয় করতে পারেন না কোন কিছু না জেনে। দোহাই আপনাদের,আমার বন্ধু মারসেলিনো পেশাদার প্রত্নতাত্বিক না হয়েও যে কাজ করেছে তার জন্য শুধু আমি কেন সারা বিশ্বের গর্ব করা উচিত।আর নিশ্চয়ই জানেন ঐ বিষয়টা আমার অন্তত শখ নয়,পেশা’।
গ্যাব্রিয়েল ফের গলা চড়ালেন-‘লজ্জার বিষয় মারসেলিনোর এই অসাধু উদ্দেশ্যকে মদত যোগাচ্ছেন মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিস্টার পেরেরার মত মানুষও। ওনাদের হাস্যকর বইতে যেসব ছবি দেখিয়ে বলা হচ্ছে সেগুলো প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহামানবের কীর্তি,সেগুলো আসলে মারসেলিনোর পোষা শিল্পী ক্যাসাইলার আঁকা কিছু নিকৃষ্ট ব্যঙ্গচিত্র ছাড়া কিছুই নয়। নিজের এলাকার মধ্যে থাকায় অবাধে সেখানে প্রবেশ করে ক্যাসাইলাকে দিয়ে গুহার দেওয়ালে ঐ সব ছবি আঁকিয়ে কৌশলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন এসব গুহামানবের কাজ। সামান্য অর্থের বিনিময়ে শিল্পীদেরও এভাবে বিকিয়ে যেতে হয় এটাই দুর্ভাগ্যের’।
সভায় রীতিমত শোরগোল পড়ে গেল এসব শুনে। একরকম ঘাড়ধাক্কা দিয়েই ঠেলতে ঠেলতে বাইরে বের করে দেওয়া হল মারসেলিনো আর পেরেরাকে সমবেত ছিছিক্কারের মধ্যে দিয়ে। অপমানে রাগে দুঃখে চলে যেতে যেতে তাঁদের কানে এল গ্যাব্রিয়েল আর কারতাইলাকের শেষ কথাগুলো
-‘পৃথিবীর তামাম সৎ প্যালিএন্টোলজিস্টের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ প্রমাণ করতেই ওদের এই কুকীর্তি। আমরা কঠোরভাবে এই ঘটনার নিন্দা করি এবং জনগণের কাছে আবেদন করি আপনারা কেউ ভুল করেও এই চক্রান্তের ফাঁদে পা দেবেননা। হয়তো নিজের অনাবাদী জমিকে পর্যটনস্থান হিসেবে গড়ে তুলতেই মহান উকিল মারসেলিনোর এই চাল!ধিক শত ধিক এই ভণ্ডকে।মূর্খরা জানেওনা যে প্রস্তর যুগের মানুষের এত উন্নত মস্তিষ্কই ছিলনা যাতে তারা এত নিখুঁতভাবে কোন প্রাণীর বা মানুষের ছবি আঁকতে পারবে;আর অত হাজার বছর আগের আঁকা হলে তার রং আজও এত উজ্বল থাকতে পারে?আসলে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া অত সহজ নয় এটা বোধহয় মাথায় ছিলনা ওদের’। এই ঘটনার পরেও দুর্ভোগ কাটলনা মারসেলিনোর। কে বা কারা হঠাৎ জালিয়াতির মামলা ঠুকে দিল তাঁর নামে। নিজে আইনজ্ঞ হয়েও তাঁকে সহ্য করতে হল সেই অপমান। কেউ একবারও সরেজমিনে গিয়ে গুহাটা দেখে আসলো না। অবশেষে বছরখানেক বাদে এডওয়ার্ড হার্লে নামে জনৈক বিশেষজ্ঞ পরিদর্শনে যান ঐ গুহাটির। ফিরে এসে তিনি যা রিপোর্ট দিলেন তাতে লেখা হল,ছবিগুলো হয়তো সমসাময়িক নাও হতে পারে,তবে কখনওই তা আদি প্রস্তর যুগ (২০ লক্ষ থেকে খৃষ্টজন্মের ১০০০০ বছর আগে পর্যন্ত) বা তার কাছাকাছি সময়ের নয়। উল্লেখ্য,এই রিপোর্টের সম্পাদক ছিলেন সেই কার্তাইলাক। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে যিনি হতে পারতেন মহান আবিষ্কারক,একরাশ অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যেতে লাগলেন সেই মারসেলিনো।সহস্রাব্দভর সবার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আলতামিরার গুহার চেয়েও গাঢ় যেন সেই তমিস্রা।হৃদরোগ গ্রাস করল তাঁকে।ছোট্ট মারিয়া সব কিছু অতটা না বুঝলেও বাবা যে ভাল নেই সেটা বেশ বুঝতে পারল সে।আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে বাবার হাতটা আঁকড়ে ধরল শক্ত করে চুপচাপ।পাথর হয়ে যাওয়া মারসেলিনো এবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মেয়েকে জড়িয়ে।

১৯০২ খৃষ্টাব্দ, সান্তাদেঁর
মারিয়া এখন যুবতী। বিবাহ করেছে কিছুদিন হল এমিলিও বোতিন নামক এক ব্যক্তিকে।মাত্র ৫৭ বছর বয়েসে তার বাবা গত হয়েছেন ১৮৮৮সালে।মারিয়া তারপর থেকেই আলতামিরার ব্যপারে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে গেছে। মাঝেমাঝে বরং তার মনে হয়,ঐ বাইসনের ছবিগুলো সেদিন না দেখে ফেললেই ভাল হত,এত লাঞ্ছনা সইতে হতনা বাবাকে।অভিশপ্ত লাগে সেই দিনটা।একদিন দুপুরে একটা চিঠি এল ডাকে। পত্রপ্রেরকের নামটা দেখে একঝলক বিরক্তি খেলে গেল মারিয়ার চোখেমুখে।এমিল কার্তাইলাক!সেই‘মহান’প্রত্নতাত্বিকদের একজন যারা ছারখার করে দিয়েছিল তাদের স্বপ্নকে।তিনি হঠাৎ এতদিন পরে?আরও কত কষ্ট দিতে চান?অনিচ্ছাসত্বেও খাম খুলে চিঠিটা মেলে ধরে সে চোখের সামনে।
প্রিয় মারিয়া,                                                                   
        তুমি আমার কন্যাসমা।তবু প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিই তুমি এবং তোমার স্বর্গত পিতার কাছে। যে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে আমরা বিরুদ্ধাচরণ করে এসেছি তাঁর,শুনে হয়তো খুশি হবে তা আজ এতকাল পরে সম্প্রতি সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে আলতামিরায় আবিষ্কৃত ঐ গুহাচিত্রগুলোর বয়েস সত্যিই কয়েক হাজার বছরেরও বেশি।এ কাজে আমাদের সাহায্য করেছে তরুণ বিজ্ঞানী হেনরি ব্রুইল।আধুনিক পদ্ধতির সাহায্যে তিনি সঠিক নির্ণয় করেছেন এর প্রাচীনত্ব। আশ্চর্য হতে হয় ক্রোম্যাগনন মানুষের এমন শৈল্পিক উৎকর্ষ দেখলে। এটা হয়তো আমাদেরই কূপমণ্ডূকতা ছিল যে প্রস্তরযুগের মানুষের ক্ষমতাকে আমরা খাটো করে দেখে এসেছি, আসলে বেশ কিছুদিন যাবৎ স্পেন ও ফ্রান্স সংলগ্ন বিস্তৃত অঞ্চলে বেশ কিছু এমন আরও গুহা আবিষ্কার করা গেছে যাতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষের ব্যবহৃত সামগ্রীই শুধু নয়, কিছু হাতে আঁকা ও পাথরে বা হাড়ে খোদাই করা অসামান্য ছবিও পাওয়া গেছে যা থেকে আমাদের মনে হয়েছিল মিস্টার মারসেলিনোর দাবী সঠিক ছিল। এইসব গুহার অনেক আগেই তোমার বাবা ঐ গিরিকন্দর আবিষ্কার করেছিলেন,একথা সত্যি! আমি কথা দিচ্ছি ওনার নামে যেসব অসম্মানজনক মামলা করা হয়েছিল,তার সবই আমি দ্রুত আদালত থেকে তুলে নেবার ব্যবস্থা করব। শীঘ্রই ঐ গুহাটি এবং কাছাকাছি আরও কয়েকটা একইরকম অঞ্চল সরকারিভাবে উদ্ঘাটন করা হবে বিশ্ববাসীর সামনে।তোমার কাছে একান্ত অনুরোধ তুমি ঐ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আমাদের গ্লানিমুক্ত কর। কুড়ি বছর আগের ভুলটা আজ শুধরে নেবার সময় এসেছে জনগণের কাছে। সত্যের কাছে সবাইকে মাথা নত করতেই হয় শেষে। যে সম্মান তোমার বাবার প্রাপ্য ছিল,আমাদের দুর্ভাগ্য সেটা তাঁকে আমরা দিতে পারিনি। ভাল থেকো।
                                                                        তোমার শুভাকাঙ্খী
প্যারিস,১৭.০১.১৯০২                                                     এমিল কার্তাইলাক।

চিঠিটা ভাঁজ করে মুড়ে শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকাল নির্বাক মারিয়া। বিকেল হয়ে আসা আলোতে সুদূরের আদিম পাহাড়শ্রেণীর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে তার চোখের কোল বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

লেখকের নিবেদনঃ আধুনিক বিশেষজ্ঞদের মতে,খৃষ্টপূর্ব ৩৫০০০ থেকে খৃষ্টপূর্ব ১১০০০ পর্যন্ত দীর্ঘসময় ধরে আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের বাসস্থান ছিল আলতামিরা গুহা। ইউনেস্কো (UNESCO) ১৯৮৫ খৃষ্টাব্দে আলতামিরা সহ কাছাকাছি অবস্থিত মোট ১৭টি চিত্রিত গুহা অধিগ্রহণ করে, তার মধ্যে আলতামিরাই প্রধান ও প্রাচীনতম। দীর্ঘদিন প্রকৃতির আলো-বাতাস থেকে দূরে থাকা শিল্পকর্মগুলো ক্ষয় হতে শুরু করেছিল প্রবল উৎসাহী মানুষদের পদার্পণের পর থেকেই,দূষণও একটা কারণ ছিল। স্পেন সরকার ও ইউনেস্কোর যৌথ উদ্যোগে মূল গুহাটির কাছেই তাই বর্তমানে অন্য একটি কৃত্রিম গুহা তৈরি করা হয়েছে আলতামিরার অনুকরণেই, নতুন করে ছবি এঁকে এবং কিছু আসল নমুনা সংগৃহীত হয়েছে সেখানে জনসাধারণের প্রদর্শনীর জন্য। মূল গুহাটির ছবিগুলি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা।

(প্রকাশিতঃ কিশোর ভারতী “চমৎকার চল্লিশ” , মে, ২০১৭)

************************************************************

ভূতচরিত
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী
vc

“মানুষ মরলে ভূত হয়। পশুপাখি মরলেও হয় নিশ্চয়ই।যাবতীয় জড়বস্তু প্রাণহীন অতএব ভূত হবার প্রশ্ন নেই। ভূত প্রধানতঃ গ্যাসীয় পদার্থ, যদিও এর আচার আচরণ বিবেচনা করে একে অপদার্থও বলা চলে। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে কঙ্কাল অর্থাৎ কঠিনরূপে, জলজ অর্থাৎ তরল ভূত এবং অত্যাধুনিক প্লাজমা ভূত ও দেখা গেছে। কিন্তু এইসব অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কোন বিশেষ নিয়ম বা নীতি আছে বলে জানা নেই।ভূতের ছায়া পড়েনা এমনটা জানা গেছে। যেহেতু আলোর সাথে ভূতের সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক এবং তুল্য সম্পর্ক আলো-অন্ধকারের মধ্যেও, অতএব ভূত একপ্রকার অন্ধকার”। .
.টেবিলল্যাম্পের আলোয় এই পর্যন্ত লিখে একটু কলম থামালেন যুক্তিবাদী লেখক প্রিয়াংশু রায়।নিজের লম্বা ছায়াটাকে হঠাৎ দেওয়ালে খুঁজে না পেয়ে একটু উৎকণ্ঠিত হলেন।সাধারণতঃ ছায়ারা মানুষের অনুসরণ করে, এখানে ব্যপারটা উল্টো ঘটায় কিছুটা বিস্মিত ও বিরক্ত হলেন তিনি।তবে ভয় পান নি মোটেও, ভয় পাওয়াটা ঠিক সম্মানজনক ব্যপার নয়।তাছাড়া সমাজে বেশ ডাকাবুকো ও সাহসী বলে নামডাক আছে তাঁর।
কলেজে পড়ার সময়ে বন্ধুদের সাথে চ্যালেঞ্জ লড়ে ফিঙ্গেপাড়ার শ্মশানে একা রাত কাটিয়ে একশ’ টাকা বাজি জিতেছিলেন। এমনকি মাথায় বিরাট কালো হাঁড়ি এঁটে গায়ে কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ভয় দেখাতে আসা নোলেকে শ্মশানের চিতা থেকে তোলা পোড়া চ্যালাকাঠ নিয়ে এমন তাড়া করেছিলেন যে বেচারা শীতের রাত্রে পালাতে গিয়ে পা ফসকে গঙ্গায় পড়ে তারপর সাতদিন ধরে কলেজের ক্লাসেও হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো করেছিল।তারপর ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় হোস্টেলের সেই ভূতুড়ে কাণ্ড।
তেতলার একটা ঘর সবসময় তালাবন্ধই থাকত।পরীক্ষার আগে প্রিয়াংশু একটু একা একা না পড়লে মনঃসংযোগের খুব অভাব বোধ করত,অথচ ঘরে বন্ধুদের রাত ১২টা অবধি হইহট্টগোলের ঠেলায় তার জো নেই। এদিকে যেই সে বলল আমি ওদিকের বন্ধ ঘরটা খুলে একটু পড়ি বরং, সবাই একবাক্যে হাঁ হাঁ করে উঠে মানা করল। কারণ জানতে চাইলে বলল, ঐ ঘরে নাকি একবার এক ছাত্র ডিপ্রেশনে ভুগে আত্মহত্যা করেছিল গলায় দড়ি দিয়ে। সেই থেকে ঐ ঘরটা ভূতুড়ে।রাতে নানারকম আওয়াজ হয়।এমনকি কেউ কেউ নাকি শূন্যে ঝুলন্ত দড়িও দেখেছে সিলিং থেকে নেমে আসতে। অনেকবার কমপ্লেন পেয়ে ওটা কর্তৃপক্ষ তালা মেরে দিয়েছে। সবাই জানে। প্রিয়াংশু বেশী পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে বলে জানতোনা।যাই হোক, সে রাতে ওটা শুনে আরও জেদ বেড়ে যায় তার।দারোয়ানকে অনেক বলে কয়ে কুড়িটাকা ঘুষ দিয়ে তালা খোলায় সেই ঘরের।মাকড়শার জাল,ধুলো টুলো ঝেড়ে সাফসুতরো করে নিরিবিলিতে পড়ে অনেকক্ষণ। তারপর ঐ ঘরেই ঘুমায় সেই রাতে।গভীর রাতে একটা খুটখাট অস্বস্তিকর আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে যায়।খাটের তলায় কিছু নড়ছে মনে হয়,একই সাথে ছাদের উপরেও কি একটা সড়সড় আওয়াজ। আর কি আশ্চর্য জানলা দিয়ে আসা আবছা আলোতে সিলিং এর দিকে চাইতে দেখা গেল সরু দড়ির মত কি একটা দুলছে অল্প অল্প। অন্য যে কেউ হলে এই পরিস্থিতিতে নির্ঘাত দৌড়ে পালাত ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে,কিন্তু আগেই বলেছি প্রিয়াংশু আলাদা মানুষ।সে ধীরেসুস্থে উঠে আলো জ্বালতে গিয়ে দেখল লোডশেডিং।তাতেও দমল না,বালিশের তলা থেকে টর্চটা বের করে সিলিঙে ফেলল সোজা। দেখল সিলিং ফ্যানের ঝোলার জায়গাটা ফাঁকা, কিন্তু কোন এক সময় সেটা ছিল। কানেকশনের একটা পুরনো তার লাট খাচ্ছে হাওয়ায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটু গেড়ে মেঝেয় বসে চৌকির নীচে চালিয়ে দিল আলোকরশ্মি।সাথে সাথে সেটা গিয়ে পড়ল জ্বলজ্বলে দুটো চোখের উপর। এক নিমেষে লম্বা লেজটা তুলে পুরনো টিনের বাক্সগুলোর ফাঁকে গিয়ে সেঁধিয়ে গেল ধেড়ে ইঁদুরটা।মুচকি হেসে এবার আবার মাথা তুলে তাকাল প্রিয়াংশু সিলিঙের দিকে।সড়সড়, মাঝেমাঝে হালকা ধুপধাপ আওয়াজ হয়ে চলেছে ছাদের উপর।ছাদের দরজাও রাতে বন্ধ হয়ে যায় দশটার পর।এখন বাজে রাত একটা।তাহলে?পা টিপে টিপে ছাদের সিঁড়ির কাছে এসে প্রিয়াংশু দেখল অনুমান সত্যি।দরজার সামনে একটা টুলে বসে  ঝিমোচ্ছে দারোয়ান।কিন্তু দরজা টা বন্ধ নয়,ভেজানো।আস্তে গলা খাঁকারি দিতেই চমকে উঠে যেন ভূত দেখল দারোয়ানজি। ইশারা করতেই চুপচাপ খুলে দিল দরজাটা।যা দেখার দেখে নিয়ে যখন নিশ্চিন্তমনে ফিরে যাচ্ছে প্রিয়, সেসময় হাতদুটো চেপে ধরে রীতিমত কাকুতিমিনতি করে বলল দারোয়ান
–“দয়া করে হস্টেল সুপারকে বলবেননা বাবু,আমি গরিব মানুষ। দুটো পয়সার লোভে ওদের কথা মানতে বাধ্য হয়েছি।হোস্টেলের এই ছেলেগুলো ভাল নয় জানি।সেজন্যই আরও ভয়।ওরা বলল মাঝেমধ্যে রাতে নিজেরা বসে একটু আধটু সিগারেট আর পানীয় টানীয় খাবে,তাস ও খেলবে।আর ছাদের ঐ দিক টাতেই বসে যার নীচে ঐ ভূতুড়ে ঘর। ফলে দুটো কাজ হয় একসাথে, নিচের ঘরে কেউ থাকতেও ভয় পায় আবার থাকেনা বলে ওরাও নির্বিঘ্নে আড্ডা দেয়।আপনার মত সাহসী কেউ আসবে আর জেনে যাবে এটা চিন্তায় আসে নি।দয়া করে জানাবেন না উপরমহলে!”
লোকটার কথায় মায়া হয়েছিল প্রিয়র। সে বন্ধুদেরও বলেনি। একদম চেপে গেছিল। শুধু সকালে হাসিমুখে ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে বলেছিল ওসব ভূত টুত বোগাস। কিসস্যু নেই। এতে অবশ্য ঐ তালাবন্ধ ঘর সম্পর্কে ভয় ভীতি খুব একটা দূর হয়েছিল কিনা জানা নেই, তবে সাহসী হিসেবে যুবক প্রিয়াংশু বেশ সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পেরেছিল বন্ধুমহলে।
ভূতের সাথে প্রিয়াংশু বাবুর কেমন একটা অলিখিত আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক যেন।ভূতের অস্তিত্ব না মানাই শুধু নয়,বিশ্বের যেখানে যত রহস্যময় আর ভূতুড়ে কারবার কাণ্ডকারখানার খোঁজ পাওয়া যায় তিনি যেচে সেখানে গিয়ে যেভাবেই হোক প্রমাণ করে  আসেন ভূত বলে কিছু নেই।ঠিক কবে থেকে তাঁর এই ভূতবিরোধিতার সূত্রপাত সেটা ঠিক জানা যায়না অবশ্য।
তা এহেন মানুষটা যখন দেখলেন পায়ের নীচে থাকা আজন্মকালের সঙ্গী ছায়াটা জায়গা বদল করেছে তখন বেশ বিরক্ত হলেন। এদিক ওদিক তাকিয়ে অবশেষে সেটাকে দেখতে পেলেন দরজার পাশে দেওয়ালে আটকে আছে চুপচাপ। খুব একটা চুপচাপ ও নয়, নড়ছে অল্প অল্প। এবং সেটাও তার নিজের ইচ্ছেমতই, প্রিয়াংশু বাবুর নড়াচড়া সেটা ফলো করছেনা একদমই।বিরক্তিসূচক একটা শব্দ বেরিয়ে এলো তাঁর মুখ থেকে “আঃ!” ব্যস এক মুহূর্ত। তারপর ছায়াটা আরও বাড়াবাড়ি করল। সুড়ুৎ করে একদম দরজার ওপাশে গিয়ে সেঁধিয়ে গেল।আর মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলেন না এই বেয়াদপি দেখে। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।এবং একটা চমক খেলেন যখন দরজার পাল্লাটা সরিয়ে কিছুই দেখতে পেলেন না।কিন্তু তিনি দমবার পাত্র নন। তাঁর এখনো মনে হচ্ছে এটা কারো না কারো চালাকি।তাঁর শত্রু নয় নয় করে কম হয়নি এইসব ভূত প্রেতের বুজরুকি প্রমাণ করতে গিয়ে। কত তান্ত্রিক জ্যোতিষীর বাজার নষ্ট হয়েছে ইয়ত্তা নেই, কত ওঝা গুণিন নিজেদের পেশা ত্যাগ করে চাষি-বাসী হয়ে গেছে তারও লেখাজোখা নেই।কত সমাজবিরোধীর হানাবাড়ির ভয় দেখিয়ে করে খাওয়া ব্যবসা লাটে উঠেছে বা কত শ্মশান,কবরখানা,গোরস্থান প্রিয়াংশু বাবুর পান্থনিবাসে পরিণত হয়েছে নিজেদের গা ছমছমে পরিবেশের বদনাম রটিয়ে সেসব ও হিসেবের বাইরে। তাই বিজ্ঞানের সেইসব শত্রুরা যে একজোট হয়ে কোন না কোনদিন তাঁকে বেকায়দায় ফেলে মজা লুটবার প্ল্যান করতেই পারে এ ব্যপারে প্রিয়াংশুবাবু একপ্রকার নিশ্চিত।তাই গজগজ করতে করতে ছায়ারহস্য উদ্ধার করতে দরজা খুলে ঘরের বাইরে লম্বা দোতলার করিডরে বেরিয়ে এলেন।বাল্ব জ্বলছে একটা, ছায়া পড়ার কথা দেওয়ালে,নেই।ছায়াটাকে এখানেও না দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন একটা। আজ প্রিয়াংশুবাবু বাড়িতে একদম একা।ছেলেকে নিয়ে স্ত্রী গেছে বাপের বাড়ি,ফিরবে আগামীকাল।কাজের মাসিও সকাল সকাল বাসন মেজে ঘর সাফসুতরো করে চলে গেছে। তারপর সেই সন্ধ্যে থেকে বসেছেন নিজের লেখার টেবিলে ভূত বিষয়ক প্রবন্ধটি লিখতে।একটি নামকরা পাক্ষিক তাদের প্রচ্ছদকাহিনীর জন্য অনুরোধ করেছে ভূত নিয়ে বেশ একটা গবেষণামূলক লেখা দিতেই হবে তাঁকে।যাতে বিশ্বাস-অবিশ্বাস,বিশ্লেষণ,যুক্তির দ্বারা সত্যের উন্মোচন সবই থাকবে। অতএব বেশ আঁট ঘাট বেঁধেই লিখছিলেন মন দিয়ে।কিন্তু তার আর জো নেই। এইসব উটকো ঝামেলা পোষায়?করিডরে দাঁড়িয়ে ভাবেন প্রিয়াংশু রায়। এমনিতে একা একমনে কাজ করার সুযোগ পেয়ে খুশিই ছিলেন তিনি,তবে এখন কেন যেন মনে হচ্ছে কেউ থাকলে বোধহয় ভাল হত।কিন্তু থাকলে কেন, বরং মনে হচ্ছে কেউ যেন আছে! আর এই ভাবনাটা আরও অস্বস্তিকর।মনে হচ্ছে ঘাড়ের পিছনেই কেউ দাঁড়িয়ে আছে, তার নিঃশব্দ নিশ্বাস পড়ছে মৃদু মৃদু,এক ঝটকায় মাথা ঘুরিয়ে যখন দেখলেন ফাঁকা সবকিছু,অজান্তে কেঁপে উঠলেন কি একটু অকুতোভয় প্রিয়াংশু রায়? দম নিলেন জোরে জোরে দুবার।মনকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন,কেউ নেই, কেউ থাকতে পারেনা।কিন্তু তবু বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল কোন অজানা আশঙ্কায়।ভূতে বিশ্বাস না থাকলেও ভূত নিয়ে যাবতীয় নামীদামী লেখকদের লেখা পড়ে ফেলা, ভূতের ছবি সব প্রায় দেখে ফেলার সুবাদে এই তথ্যটুকু তাঁর অজানা নয় যে একমাত্র মৃত মানুষেরই ছায়া পড়েনা, যখন তারা প্রেতরূপে বিচরণ করে মর্ত্যে।অথচ তিনি তো দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন।এই খটকা টাই তাঁকে ভিতরে ভিতরে অস্থির করে তুলল।হঠাৎ কি একটা মনে পড়ায় হুড়মুড়িয়ে এগোলেন বাথরুমের দিকে। দেওয়াল জোড়া একটা আয়না আছে সেখানে।প্রতিবিম্ব তো সেখানেও পড়ে।একটা মরিয়া প্রচেষ্টা ছায়া ধরার।পৌঁছোবার আগ পর্যন্ত প্রতিটা পদক্ষেপে প্রিয়াংশু বাবু টের পেলেন সেই অদৃশ্য অস্তিত্বের উপস্থিতি।ছায়ার মত, কিন্তু ছায়া নয়।দাঁতে দাঁত চেপে মনের সমস্ত শক্তি একত্র করে বাথরুমের দরজাটা খুলেই আয়নার দিকে চোখ রাখলেন, আর রেখেই আপনা থেকে বিস্ফারিত হয়ে যাওয়া চোখে অবিশ্বাসী দৃষ্টি ফুটে উঠল তাঁর, মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরোল একটা আর্তস্বর।
আয়নাতে নিজের ছায়ার বদলে এটা কে? অন্য একটি কমবয়েসী ছেলের অবয়ব, কিন্তু ছেলেটা তাঁর ভীষণ চেনা।কোথায় দেখেছেন আগে স্মৃতি হাতড়াতে থাকেন।তার একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা তীক্ষ্ণ চাহনি অবশ করে ফেলে প্রিয়াংশুকে।সম্মোহিতের মত  থমকে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন করেন “কে …কে তুমি”? প্রতিবিম্ব মুচকি হাসে রহস্যময় ভঙ্গিতে।“চিনতে পারছনা? সব ভুলে গেছ এই ক’ বছরে?ভাল করে দেখো আরেকবার প্রিয়াংশু রায়!” আরেকবার তাকাতে বাধ্য হন তিনি অগত্যা, বাধ্য বললাম এই কারণে, যে প্রিয়াংশু রায় ভয় পেয়েছেন একটু।না, একটু না অনেকটাই।ছেলেটাকে আয়নার ভিতরেই দেখতেন তিনি,তবে আজ থেকে অন্তত বছর কুড়ি আগে।শূন্য বাড়িতে এই স্নানঘরের ছোট্ট পরিসরে আজ মুখোমুখি তিনি আর তাঁর অতীত।আচ্ছা ভূত মানেও তো অতীত?এই আসল কথাটা তাঁর মাথায় এখনো না আসায় নিজের প্রতিই অসন্তুষ্ট হলেন একটু। তার মানে ভূত মানুষের জীবিত অবস্থাতেও তৈরি হতে পারে? কেউ বেঁচে থাকতে নিজেই নিজের ভূতকে চাক্ষুষ করেছে এমন উদাহরণ মনে হয় নেই এ বিশ্বে।মনের মধ্যে সাইক্লোন ওঠার শব্দ টের পেলেন প্রিয়াংশু।তাঁর বিহ্বল অবস্থা কাটতে না কাটতেই ওপারের তরুণ প্রিয়াংশু বলে উঠল “সবার কাছে লুকানো যায় কিন্তু নিজের কাছ থেকে নিজে লুকানোর জায়গা কোথাও নেই যে এ দুনিয়ায় সেটা তোমার নিশ্চয়ই ভাল করেই জানা আছে? অকুতোভয় অসমসাহসী প্রবল যুক্তিবাদী প্রিয়াংশু রায় যে ছোটবেলায় একলা অন্ধকারে একটা আরশোলা দেখেও লাফিয়ে উঠত, ভূতের ভয়ে লোডশেডিং হলেই ‘রাম রাম রাম’বলে  উচ্চৈঃস্বরে চেঁচাত সে খবর আর এখন কে রাখে? যারা জানত তার মধ্যে তোমার মা বাবা,তাঁরা তো গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন হল আর বন্ধুরা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে এদিক ওদিক স্কুলের পর।তুমি এখন খানিকটা বিখ্যাত হয়েছ,তাদের সাথেও যোগাযোগ নেই। তার মানে তোমার এই একটা অন্ধকার দিক তুমি ছাড়া আর কারওরই জানা নেই তেমন।কিন্তু তার সুযোগে তুমি যে এইভাবে ভূতের অস্তিত্ববিরোধী  সব ভাষণ দিচ্ছ, সামান্য কয়েকটা বুজরুক কে ধরে প্রমাণ করতে চাইছ সত্যিকারের ভূত নেই, সেটা কি ঠিক? তোমার থেকে কি আর কেউ ভাল জানে তেনারা যে সত্যি বর্তমান?” এই অবধি বলে আয়নার ছেলেটা থামল একটু। প্রিয়াংশু কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না,অনেকদিন পর যেন একটা পুরনো ঘরের তালা খোলা হল,একরাশ ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে তার থেকে বেরিয়ে এলো সযত্নে লুকানো কিছু গোপন দলিল।ফ্ল্যাশব্যাকের মত মনে পড়ে গেল তাঁর বাইশ বছর আগের এক রাতের কথা।
তখন  তিনি ক্লাস নাইন। টিউশন সেরে ফেরার সময় হঠাৎ লোডশেডিং। পাড়ারই সহপাঠী বন্ধু বাবলুর সাথে সাইকেলে বাড়ি অবধি মিনিট পনেরোর পথটা ফেরেন রোজ একসাথে।আর এমনই কপাল, সেদিনই বাবলুও অ্যাবসেন্ট। ভাদ্র মাস, কেমন যেন একটা গুমোট গরম, চারদিক থমথমে। সন্ধ্যে হবার আগে একঝাঁক কালো মেঘে আকাশ ঢাকা পড়ল।অন্ধকার রাস্তায় ফেরার সময় সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে কিছুটা এগোতেই বৃষ্টি শুরু হল টিপটিপ।মেঘ গর্জন করে আলো ঝলসে উঠল আকাশের প্রান্তসীমা বরাবর।এই রাস্তা টা এমনিতেই অন্ধকার থাকে দুপাশে লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দৈত্যাকার ঝাঁকড়া শিরীষ গাছগুলোর জন্য,আজ আরও বেশী মনে হচ্ছে যেন।আজ কি অমাবস্যা? হঠাৎ এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকে উঠল কাছেই কোথাও। কান ফাটানো শব্দটাও প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই।সাইকেলটা অন্ধকারে একবার পাক খেয়ে শূন্যে উঠে গেল। প্রিয়র খালি মনে হচ্ছে সাইকেলটা একটা কালো গুহার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। মাটির নীচে গভীর থেকে গভীরে।চাকার নীচে মাটির স্পর্শটাও পাচ্ছেনা আর।ভয়ে হাত পা অবশ হয়ে আসে প্রিয়র।সে নিজেকে ছেড়ে দেয় অদৃষ্টের হাতে। একটা ঝাঁকুনি খেয়ে টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঘন অন্ধকারে।সাইকেলটা ছিটকে পড়ে কোথাও একটা, হাঁটুতে বেশ জোরে লাগল।অন্ধের মত হাতড়াতে হাতড়াতে এগোতে থাকে সে হামাগুড়ি দিয়ে। নাকেমুখে মাকড়শার জাল জড়িয়ে যায়।আর ঠিক তখন যেন পাতাল থেকে উঠে আসা একটা নীলচে আলো ধোঁয়ার মত ঘিরে ফেলতে থাকে চারপাশ, সাথে একটা গুবগুব শব্দ জলস্রোত এগিয়ে আসার কোন প্রাচীন অতল থেকে। জোনাকির মত অথবা ঠিক জোনাকি নয় আরও তীক্ষ্ণ কয়েক জোড়া চোখ জ্বলে উঠতে থাকে চারপাশে তাকে ঘিরে। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতেও প্রচণ্ড অবাক হয়ে যায় প্রিয় এটা ভেবে যে সে কিভাবে এখনো বেঁচে আছে ভয়ে হার্টফেল না করে।মনে হয় ভয়ের চূড়ান্ত সীমা থাকে কোন একটা। সেটা পেরিয়ে গেলে আর ভয়ের অনুভূতিটা কাজ করেনা ঠিক।যেমন দেখা যায় ডাক্তারবাবুদের দেওয়া কড়া কড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে করে সাধারণ ওষুধে আর জ্বরজারি কমেনা আজকাল কারো।ধোঁয়া গুলো চোখের সামনে অবয়ব নেয়,সব গুলো একরকম,আরেকটু স্পষ্ট হলে দেখা গেল তারা সবাই প্রিয়রই প্রতিরূপ, ডুপ্লিকেট যাকে বলে! স্থির চোখে চেয়ে আছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। কি বলবে ভেবে পায়না প্রিয়। তো তো করে বলে “তো- তোমরা কারা? আমি কোথায়?” একটা কান ফাটানো অট্টহাসিতে কেঁপে ওঠে চারপাশ।৪-৫ জন একসাথে বলে ওঠে গমগমে স্বরে “ আমরা তোমার মনের মধ্যে জমে থাকা ভয়,ভীতি। প্রতি মুহূর্তে তুমি যে ভয় পাও,অন্ধকার কে, অদেখা কে,সরীসৃপ বা বিসদৃশ কোন প্রাণী কে,তাদের মিলিত রূপ হলাম আমরা। তুমি ভয়ের সামনাসামনি হতে চাওনা আসলে।আজ সামনে বাজ পড়ায় হাত আচমকা কেঁপে গিয়ে তোমার সাইকেলটা গড়িয়ে রাস্তার পাশের নয়ানজুলিতে পড়ে যাবার সময় সেই ভয়েই তোমার হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়েছে কিছুক্ষণের জন্য।তুমি এখন দুই দুনিয়ার মাঝের স্টপেজে।এখনো ওদিক থেকে সবুজ সিগন্যাল আসেনি।তোমার শরীর এখনো মৃত নয়। খাঁচার জানলার কাছে মুখ বাড়িয়ে আছে তোমার প্রাণপাখি।একমাত্র যদি তোমার মনের এই ভয় তোমায় ছেড়ে চলে যায়, তাহলে আবার ফিরে যেতে পারো চেনা পরিবেশে,মর্ত্যলোকে, পার্থিব শরীরে ভর করে। কিন্তু তোমার মধ্যে সে সাহস কি আছে?মনে তো হয়না” … “আছে আছে আছে!” চীৎকার করে উঠল সর্বশক্তি দিয়ে প্রিয়াংশু। বাঁচার অদম্য ইচ্ছায় যেন বেঁধে রাখা অনেক গুলো শিকল এক লহমায় ছিঁড়ে কেটে উঠে দাঁড়াল সে উত্তেজিত হয়ে।“তাহলে বলছ ভয় পাবে না আর? কিছুকেই?” —“না  আ আ আ! কক্ষনো না, কাউকেই না!আমি বাঁচতে চাই নির্ভীক ভাবে।কাউকে ডরাবোনা, কিচ্ছুকে না…” বলতে বলতে প্রিয় দেখতে পায় ছায়ামূর্তিগুলো কেমন যেন মোমের মত গলে গলে পড়ছে, মিশে যাচ্ছে ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় আবার। প্রবল উত্তেজনায় জ্ঞান হারায় সে।
জ্ঞান ফিরে দেখল হাসপাতালের বেডে শুয়ে।কয়েক জায়গায় ব্যান্ডেজ। চারপাশে উদ্বিগ্ন প্রিয়জনদের মুখ।কিন্তু প্রিয়াংশু রায় সেদিন থেকেই অন্য মানুষে বদলে গেছিল।এক ঝটকায়।আর আজ এতদিন পর যেটা ঘটল সেটা আরেকটা বদল নিয়ে আসলো হয়তো।
সব ঘটনা গুলো পরপর মনে পড়ে যাবার পর কপালের ঘাম মুছতে মুছতে প্রিয়াংশু রায় দেখলেন মুখোমুখি আয়নাতে অবিকল তাঁর পঁয়ত্রিশ বছরের চেহারার লোকটাই ঘাম মুছছে ভয় ভয় চোখে তাকিয়ে। চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকালেন আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন একটা। ফিরে এসেছে মূর্তিমান ছায়া যথাস্থানে। তবে তার সাথে আরেকটা জিনিসও ফিরে এসেছে নতুন করে। ভূতে বিশ্বাসটা।এবং এটা পার্মানেন্ট।কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক পড়ল যে।চোখেমুখে জল দিয়ে এসে আবার লেখার টেবিলে বসেন প্রিয়াংশু রায়।
“ভূত খুব জটিল বস্তু।বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে সবসময় এর ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। তাই কোন থিয়োরি দিয়েই ভূতকে বর্ণনা করা যাবেনা। শুধু এটুকু বলে রাখি,ভয় থাক বা না থাক, ভূত ছিল, ভূত আছে, ভূত থাকবে”।……
[প্রকাশিতঃ কিশোর ভারতী,জুন, ২০১৬]

উল্টো সময়
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

psx_20160529_103232

হরিপদ রোজ সকাল হলেই বেরিয়ে পড়ে তার লজঝড়ে মান্ধাতা আমলের সাইকেলটা নিয়ে,পদ্মফুলছাপ চর্মরোগবিনাশী মলম আর ঘোড়ামার্কা বাতের ব্যথার মলম ফিরি করতে।বেতের বাস্কেটে আটকানো বেঢপ চোঙা থেকে অবিরাম বেরোতে থাকে তার খ্যানখেনে কণ্ঠস্বর, একহাতে মাইক ধরে অন্যহাতে হ্যাণ্ডেল,পিছনে ক্যারিয়ারের সাথে বাঁধা দুটো ঝুড়িতে বোঝাই করা মলম সাম্রাজ্য।সোনাডাঙ্গা গ্রামের শেষ প্রান্তে যেখানে বেখেয়ালি বাঁশঝাড় জড়ো করে রেখেছে রাজ্যের অন্ধকার, ইটপাতা সরু ফালি রাস্তাটা হঠাৎ করে থমকে গেছে সেখানে একটা টিনের চালাঘরে হরিপদর আস্তানা কাম ল্যাবরেটরি।পড়াশোনার পাট চুকেছিল সেই কোনকালেই, অকালে বাবা মা দুজনেই গত হবার পর তার দূরসম্পর্কের এক মামা তাকে এই মলম তৈরির কাজ শিখিয়েছিল শহরের একটা কারখানায় নিয়ে গিয়ে হাতেকলমে।সেখানে ঐ মামাও কাজ করতেন।তারপর আস্তে আস্তে আগ্রহের আতিশয্যে পুরো প্রক্রিয়াটা রপ্ত করে ফেলে হরিপদ।আর উৎসাহী হয়ে একদিন নিজেই বাড়ী ফিরে এসে গবেষণাগার বানিয়ে সেখানে তৈরি করে বেচতে শুরু করে ঐ মলম।যৎসামান্য যা জমান টাকা ছিল তাই সম্বল করে শুরু হয় তার পথচলা।কিন্তু অনেকেই জানতনা এহেন হরিপদর একটা অদম্য উৎসাহী, কৌতূহলী আর নাছোড়বান্দা মন ছিল যার একটা ফলশ্রুতি তার একটা গোপন শখ- এটা সেটা কেমিক্যাল কিনে তাদের নানারকম ভাবে মিলিয়ে মিশিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, খাতায় তাদের ফলাফল টুকে রাখা আর নতুন কিছু আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখা।বলতে গেলে এই শখের কারণেই তার সঞ্চয় কোনদিনই কিছু হয়নি উল্টে চাল বাড়ন্ত হয়েছে ঘরে।এইজন্য তার বিয়েটাও করা হয়ে ওঠেনি আর গ্রামের আর পাঁচটা মানুষের থেকে এড়িয়ে থাকার জন্য আস্তানাটা বানিয়েছে প্রান্তিক অংশে।এসব পরীক্ষার বেশির ভাগই অসফল হয় বলাই বাহুল্য কিন্তু পুনরায় নয়া উদ্যোগে কাজ শুরু করে হরিপদ। আজকাল তার গবেষণার উদ্দেশ্য এমন একটা মলম আবিষ্কার করা যা মাইগ্রেন সাইনাসের মত সারতে না চাওয়া যাবতীয় মাথাব্যথা নিমেষে দূর করে দিতে পাড়বে।সারাদিন সাইকেলে টোটো করে রোদেজলে ঘুরে বিক্রিবাটা করার পরে সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে আবার ঐ সব বিদঘুটে গন্ধের শিশিবোতল নিয়ে বসতে তার উৎসাহ কীভাবে আসে সেটা ভেবে অনেকেই আশ্চর্য হতে পারত কিন্তু হরিপদর স্বেচ্ছা একঘরে হয়ে থাকার অভ্যাস তাতে বাদ সেধেছিল।তবে শুধু একজনকে সে ভারী ভক্তি-শ্রদ্ধা করত,মতামত পরামর্শ নিত যখন তখন।তিনি গ্রামের স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক অলোকবাবু।তিনিও ওকে স্নেহ করতেন বেশ, বুঝতেন তার যতটা না উৎসাহ উদ্দীপনা সে তুলনায় বুদ্ধি বা কর্মক্ষমতা বিশেষ নেই,তবুও ওর সারল্য আর আন্তরিক প্রচেষ্টার তারিফ করতেন আর খুঁটিনাটি উপদেশও দিতেন যথাসাধ্য।

সময় চলে যায় নিস্তরঙ্গ গতিতে আপন খেয়ালে।শান্তশিষ্ট সোনাডাঙ্গা গ্রামের মানুষদের জীবনে তেমন উত্তেজক কোন ঢেউ আসেনা,কিন্তু ঝড় যখন আসে জানিয়ে আসেনা।সেদিন ছিল দুর্যোগের রাত।বৃষ্টি পড়ছিল অল্পস্বল্প কিন্তু ঝোড়ো হাওয়ার দাপট বাড়ছিল।এদিকে ঝুলকালি পড়া লণ্ঠনের আলোয় একনিষ্ঠ ভাবে হরিপদ একটা চীনেমাটির খলের মধ্যে বেশ কয়েকটা রাসায়নিক একটু জল দিয়ে মিশিয়ে নুড়িটা দিয়ে ঘষছিল।কোনদিকে তার হুঁশ নেই।হঠাৎ তীব্র একটা আলোর ঝলকানি আর কান ফাটানো শব্দ। বোঝা গেলনা কারণটা ঠিক কী,কাছে কোথাও বজ্রপাত হল নাকি হরিপদর মিশ্রণের উপাদান থেকেই বিস্ফোরণ ঘটল নাকি দুটোই একসাথে।তবে সেটা ভাবার বিষয় নয়,আমরা দেখি হরিপদর কোন ক্ষতি হল কিনা এতে।না,পাঠকের চিন্তার কারণ নেই,হরিপদ বেঁচে আছে।তবে তাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেল তার আধপোড়া ভগ্নস্তূপ গবেষণাগারের মেঝেয়।বেশির ভাগ জিনিসই নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার সেই খল নুড়িটা দিব্যি অক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে পাশে,শুধু তাই নয়,স্বচ্ছ জলের মত দেখতে কী একটা পাথরের টুকরো পড়ে আছে ওর মধ্যে।এভাবে সকাল হল। দুর্যোগের রাত কেটে স্বস্তির রোদ উঁকি মারল পূব দিগন্তে,হরিপদ দুর্বল ভাবে আস্তে আস্তে চোখ মেলল। সাথে সাথে তার কাল রাতের ঘটনা বিদ্যুচ্চমকের মত মনে পড়ে গেল আর এক ঝটকায় উঠে বসল।প্রথমে সব দেখে খানিকক্ষণ হাঁ করে থাকল বাকরুদ্ধ হয়ে, মাথা টা ঘুরে উঠল আর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল একটা কষ্টে, ঠিক তখনি তার নজর পড়ল অদূরে পড়ে থাকা খল নুড়ির মধ্যে ঐ স্ফটিকস্বচ্ছ প্রস্তরখণ্ড।চারপাশে তখনো পোড়া গন্ধ, তার অসমাপ্ত গবেষণাদের সমাধি ছাইয়ের আবরণে ঢাকা পড়ছে, ঘরের টিনের চালটা দুমড়ে উড়ে গিয়ে পড়েছে অনেকটা দূরে।তবু কী একটা অমোঘ আকর্ষণে সব কিছু মুহূর্তের জন্য দূরে সরিয়ে রেখে হরিপদ ঐ স্বচ্ছ টুকরোটাকে হাতে তুলে নিল আর ‘যা আছে কপালে’ ভেবে ওটা কপালে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে একবার ঘষে দিল আনমনে।সঙ্গেসঙ্গে যেন একটা হিমশীতল বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে গেল তার শরীরে। মাথাটা ঘুরে উঠল প্রবলভাবে আর চোখের সামনে সারা পৃথিবীটা দুলে উঠেই অন্ধকার হয়ে গেল মুহূর্তে।পুনরায় সংজ্ঞা হারানোর পূর্বমুহূর্তে হরিপদর মনে হল তার দেহটা পালকের মত হালকা হয়ে ভাসতে ভাসতে যেন মেঘের পানে ছুটে চলেছে আলোর বেগে। কোন একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে গিয়ে সে যেন আছড়ে পড়ল কোথাও। একটা মৃদু ঝাঁকুনির সঙ্গে তার চোখ খুলে গেল আপনা থেকেই।চোখ কচলে চারদিকে তাকাতেই ভীষণ অবাক হয়ে গেল হরিপদ।দেখল প্রশস্ত রাজপথ,দুপাশ পাথরে বাঁধানো।ঝকঝকে তকতকে চারপাশ।দূর থেকে একটা ঘোড়ার গাড়ী ছুটে আসছে, তার আরোহীর গায়ে অদ্ভুতদর্শন জরির কাজকরা পোশাক,হাতে বল্লম,মাথায় শিরস্ত্রাণ যেমনটা ঐতিহাসিক যাত্রাপালায় দেখেছে সে সোনাডাঙ্গার মাঠে। কিন্তু এটাতো যাত্রা বলে মালুম হচ্ছেনা।জটপাকানো ভাবনা নিয়ে সে হাঁটতে থাকে রাজপথ ধরে।কিছুদূর এগোতেই দেখতে পেল পাথরে গড়া বাড়িঘর,কিছু মাটির তৈরি খড় ছাওয়া বাড়িও দেখা যাচ্ছে।কিন্তু কংক্রিটের চিহ্নমাত্র নেই।হঠাৎ খিলখিল হাসির শব্দে চমকে পিছনে ফিরে দেখতে পেল একঝাঁক কমবয়েসী মেয়ের দল কলসি কাঁখে জল নিয়ে ফিরছে,তাদের পোশাক পরিচ্ছদও ভারী অদ্ভুত,মাথায় হাতে পায়ে ফুল দেওয়া,সোনার গয়না পরা!এমনভাবে চলেছে যেন ছিনতাইয়ের কোন ভয় নেই।ব্যপারটা বোধগম্য হবার আগেই কানে আসে দামামার শব্দ।ঘোড়ার গাড়ী চড়ে কয়েকজন শিঙা ফুঁকতে ফুঁকতে আর দামামা বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসছে। বেশ লোক জড়ো হয়ে গেল চারপাশে। তারপর বাজনা থামিয়ে একজন চেঁচিয়ে বলে উঠল – “প্রিয় প্রজাগণকে ভারতের অধীশ্বর সম্রাট অশোকের বার্তাঃ সম্রাট দেশসফরে বেরিয়েছেন,ভগবান বুদ্ধের বাণী ও উপদেশ প্রচার করতে শীঘ্রই তিনি এ রাজ্যেও পৌঁছে যাবেন।আপনারা সকলে শান্তি সদ্ভাব বজায় রাখুন। বুদ্ধং শরণম গচ্ছামি”। হরিপদ এবার সত্যি ভয় পেয়ে যায়।বসে পড়ে পথের মধ্যেই মাথাটা চেপে ধরে।সেই ছোটবেলায় পড়া পুরো ইতিহাসবইটা যেন চোখের সামনে জ্যান্ত দেখতে পাচ্ছে সে,অথচ তাকে যে কেউ খেয়াল করছেনা সেটাও বেশ বুঝতে পারছে।তালগোল পাকানো মগজটাকে শান্ত করতে অজান্তেই আবার হাতটা ঘষে কপালে আর তখনি ভোজবাজি ফের।কোথায় গেল লোকলস্কর ঘোড়ার গাড়ী প্রাচীন পথঘাট। আবার সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গ ধরে এক ঝটকায় তার ছুটে চলা এক দুর্নিবার গতিতে।তারপর দম নিয়ে চোখ মেলল আশপাশটা শান্ত মনে হতে।দেখল সে বসে আছে নিজের ভাঙ্গাচোরা ল্যাবরেটরিতেই।হাতে ধরা সেই আশ্চর্য বস্তু।তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে সে ব্যপারটা কিছুটা আন্দাজ করে। এ সবই তাহলে ঐ পাথরের কেরামতি।কিন্তু কীভাবে? মাথায় ঢোকেনা তার। কিন্তু যিনি ব্যখ্যা করতে পারবেন তার কথা মনে হল হরিপদর। অলোকবাবু।পাথরের টুকরোটা নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ল সে ওনার বাড়ী।সবকিছু একনিঃশ্বাসে বলে হাঁপাতে হাঁপাতে ধপাস করে মেঝেয় বসে পড়ল সে। অলোকবাবু প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না কিন্তু যখন কাঁপা কাঁপা হাতে হরিপদর বাড়িয়ে দেওয়া পাথরটা দেখলেন তখন সত্যি অবাক হলেন আর কৌতূহল ও বাড়ল প্রচণ্ড ওর কথার সত্যতা প্রমাণ করে দেখতে।নেড়েচেড়ে দেখে তিনি পরিচিত কোন বস্তুর সাথে মিল পেলেন না জিনিসটার।হরিপদকে  ইচ্ছের কথা বলতে সে তো এককথায় রাজী। বেচারা ঘটনার আকস্মিকতায় এতই বিহ্বল যে আর অন্যকিছু ভাবার অবস্থাতেই নেই। অসহায় দৃষ্টিতে সে ওটা সমর্পণ করল অলোকবাবুর হাতে। “কয়েকদিন এটাকে নিয়ে একটু পরীক্ষা করে দেখতে হবে বুঝলি? নইলে ঠিক বুঝতে পারবোনা ব্যাপারটা”।
নিঃশব্দে ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে যায় হরিপদ। আর অলোক বাবু মগ্ন হন পাথরটাকে নিয়ে।টানা তিনদিন তিনরাত সম্ভাব্য সবরকম শনাক্তকরণ পরীক্ষা চালিয়েও পরিচিত কোন পদার্থের সাথে জিনিসটার বাহ্যিক বা আভ্যন্তরীণ গঠন ও প্রকৃতির কিছুমাত্র সাদৃশ্য খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলেন তিনি।তবে কয়েকটা তথ্য পাওয়া গেল যেগুলো শুধু যে চমকপ্রদ তাই নয়,রীতিমত যুগান্তকারী বলা চলে।সাধারণ কয়েকটা রাসায়নিক হঠাৎ প্রচণ্ড তাপ আর তড়িৎপ্রবাহের ফলে বিশেষ একটা কেলাসে রূপান্তরিত হয়েছে যার বর্ণ স্বচ্ছ। হয়তো ঐ বিরাট পরিমাণ তাপ-তড়িতের উৎপত্তি সে রাতের বজ্রপাতই।কিন্তু এই কেলাসের আসল রহস্যটা অন্য।অলোকবাবু দেখলেন,এই কেলাস গঠনকারী অণুগুলোর মধ্যে একটা কম্পন সৃষ্টি হচ্ছে যে কোন প্রাণীশরীর কে কাছাকাছি আনলেই। আর তখনি হরিপদর সাথে ঘটে যাওয়া কাণ্ডটার একটা সূত্র পেলেন তিনি।বুদ্ধিমান অলোক মিত্র বুঝলেন মাথার সাথে ঐ কেলাসের স্পর্শে ও ঘর্ষণে যে তাপ উৎপন্ন হচ্ছে তা ক্ষণিকের মধ্যে ওর অণুগুলোকে প্রবলভাবে কম্পিত করে একটা বিশেষ তরঙ্গের সৃষ্টি করছে, এটা অনেক কেলাসের ক্ষেত্রেই ঘটে অবশ্য যেমন স্ফটিক বা কোয়ার্টজ কেলাসের নিয়মিত কম্পনকে এভাবে ব্যবহার করে ঘড়িকে এখন অনেক আধুনিক ও নির্ভুল করা গেছে।কিন্তু এই নতুন জিনিসটা যা করছে সেটা এক কথায় অকল্পনীয় ও অভূতপূর্ব।এর থেকে নির্গত তরঙ্গ মানব মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে অনবরত কাজ করতে থাকা সূক্ষ্ম চিন্তাতরঙ্গের সাথে জোট বেঁধে অনুনাদ ঘটাচ্ছে।যার ফলে মস্তিষ্ক এক বিশেষ আচ্ছন্নতার মধ্যে প্রবেশ করছে। ঐ অনুনাদী তরঙ্গের বেগ গণনা করে দেখা গেল আলোর থেকেও বেশী, সেকারণে একটা ভার্চুয়াল টাইম মেশিনের মত কাজ করছে এই আশ্চর্য পাথর আর শরীরকে অচেতন অবস্থায় বর্তমানেই ফেলে রেখে মানুষের আত্মা বা অন্তর স্বত্বা কে নিয়ে যাচ্ছে সুদূর অতীতে।আবার কপালে হাত ঘষলে সেই প্রভাব প্রশমিত হয়ে বর্তমানে ফিরিয়ে আনছে তাকে।কথায় বলে ‘নাদ ব্রহ্ম’। বিজ্ঞানীদের মতে এবং পুরাণমতেও জগতের সৃষ্টি একটা অমোঘ শব্দের থেকেই।আর শব্দ মানেই কম্পন। এও সেই কম্পনেরই এক মায়াবী খেলা। সময়ের সীমা পরিসীমা মুছে যাচ্ছে এর এক ছোঁয়ায়। কালের গর্ভে তলিয়ে থাকা সময় জীবন্ত হয়ে উঠছে পলকে। অজান্তে এবং দুর্ঘটনাজনিত এই আবিষ্কারের তাৎপর্যের কথা ভেবে রোমাঞ্চিত হন অলোক মিত্র।তবে মুশকিল একটাই। একে ইচ্ছেমত নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা, কোন সময়ে যেতে চাই সেটা স্থির করার একটা ঊপায় বের করে ফেলতে পারলেই এটা ভীষণ কার্যকরী একটা যন্ত্র হয়ে ঊঠবে সময়ের মানস ভ্রমণের।অলোকবাবুর মাথায় এই ভাবনাগুলো আসা মাত্রই একটা কাঁটা খচখচিয়ে উঠল তাঁর মনে। আচ্ছা এই আবিষ্কার যদি লোকসমাজের সামনে আনা যায় তখন সিংহভাগ কৃতিত্ব আর সুনামই তো জুটবে ঐ হতভাগা অশিক্ষিত হরিপদর নামে। যে এর বিন্দুবিসর্গও বুঝবেনা।আর তিনি যে কষ্ট করে এত পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আসল কারণটা বের করলেন তাঁর সাফল্যের ফল ভোগ করবে ঐ ব্যাটা। বিরক্তিতে ভরে উঠল তাঁর মন।তখনি একটা দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গেল মাথায়।আচ্ছা তিনি ছাড়া আর তো কেউ এখনো জানেইনা ব্যপারটা সম্পর্কে আর সে সম্ভাবনাও কম যেহেতু হরিপদর একমাত্র ভরসার স্থল তিনি স্বয়ং। এ কথাটা ভেবে একটু দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন আবেগের হাত থেকে।এটা আপামর সাধারণ মানুষের উপযোগী একটা আবিষ্কার , বিজ্ঞানের জন্য একটা লড়াই। আর কে না জানে যুদ্ধের জন্য সবই ন্যায়সঙ্গত।তাই হরিপদকে যদি তারই ওষুধে কাবু করে রাখা যায় তবে কেমন হয়? যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। হরিপদর চালাঘরে উপস্থিত হলেন অলোক বাবু।এটা সেটা বলতে বলতে হঠাৎই জোর করে হরিপদর কপালে ঘষে দেন সেই পাথর, আর অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় তার হাতদুটো  বেঁধে ফেললেন। যাতে চট করে কপালে হাত রেখে ফিরতে না পারে সে এসময়ে।হরিপদর অচেতন দেহটা এলিয়ে পড়ে মেঝেয়।সেটাকে টানতে টানতে ওর নিজের ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে পাথরটা নিয়ে বাড়ী ফেরেন অলোকবাবু নিশ্চিন্তমনে। বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দেয় তাঁর কপালে, শুকিয়ে আসা জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁটটা আনমনে ভিজিয়ে নিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালটা মুছে ফেলেন তিনি। মুছে ফেললেন মনের গভীরে এখনো উঁকি মারতে থাকা অস্বস্তির দাগটাকে। এর পর সামান্য খাটাখাটনি করে মিস্টার মিত্র বানিয়ে ফেললেন একটা বিশেষ হেলমেট যেটাতে ফিট করা হল আশ্চর্য  ক্রিস্টাল ‘মিত্রিয়াম’ এর এক এবং অনন্য টুকরোটি। হেলমেটের সাথে লাগানো নিয়ন্ত্রক নবের সাহায্যে একজন ইচ্ছেমত সময়ে ঘুরে আসতে পারেন, সময় সেট করার পর শুধু একটা বোতামে চাপ দিতে হবে হেলমেটের কপালের মাঝখানে যেটা মিত্রিয়ামকে স্পর্শ করাবে মাথায় আর সত্যি করবে স্বপ্ন।
পরীক্ষা করার জন্য তিনি নিজেই হেলমেটটা পড়ে নিলেন মাথায়।নব সামান্য একটু ঘুরিয়ে কপালে বোতামটা টিপে চলে গেলেন বিংশ শতকের প্রথম ভাগে। দেখলেন একটা বড়সড় মাঠ। কাতারে কাতারে লোক জড়ো হচ্ছে । সাজ সাজ রব চারদিকে। হঠাৎ তুমুল করতালির শব্দ। দেখা গেল জমিদার স্থানীয় কোন ব্যক্তি এক গোছা ফুলের মালা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন মঞ্চে উপবিষ্ট এক প্রৌঢ়ের দিকে। কালো জোব্বা পরা সেই ভদ্রলোক উঠে দাঁড়াতেই আরেক প্রস্থ তুমুল হর্ষধ্বনি। সাদা বাবরি চুল,মাথায় কালো অদ্ভুত টুপি আর একরাশ অবিন্যস্ত কাঁচাপাকা দাড়িবিশিষ্ট ঐ মানুষটাকে দেখেই অলোকবাবুর মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় স্কুলে পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানে ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা। রবীন্দ্রনাথ! আহ! কবিগুরু এরপর মাইক্রোফোনের সামনে এসে ভরাট গলায় আবৃত্তি করে উঠলেন ‘দে দোল দোল…’। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল অলোকবাবুর।দুলে উঠল যেন সত্যি ব্রহ্মাণ্ড ।বাস রে! কী জিনিসই না হয়েছে এটা! তড়িঘড়ি কপালে হাত ছুঁইয়ে আবার ফিরে এলেন নিজের ঘরে।সে মাসেই বিদেশের এক প্রখ্যাত সায়েন্টিফিক জার্নালে প্রকাশিত হল বাঙালী বিজ্ঞানী অলোক মিত্রের এই আবিষ্কারের কথা। সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠলেন তিনি। খবরের কাগজের প্রথম পাতায়, টি.ভী চ্যানেলের জনপ্রিয় টক শো তে সব জায়গায় দেখা যেতে থাকল মিত্রিয়ামের পেটেণ্ট নেওয়া অলোকবাবুকে।  বাণিজ্যিকভাবেও এই হেলমেট বাজারে আনার জন্য বিভিন্ন বড়সড় সংস্থা প্রচুর টাকার চুক্তি করতে চাইল তাঁর সাথে। কিন্তু তিনি কিছুটা সময় চেয়ে ব্যপারটা এড়িয়ে গেলেন সযত্নে। আসলে সবকিছু হলেও এখনো তো অলকবাবুর কাছে অধরা এই ক্রিস্টালের প্রস্তুতি রহস্য।ওটা না জানলে এই মহামূল্যবান জিনিসটার কোন প্রতিরূপ গড়ে তোলা যাবেনা অর্থাৎ ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম এখনো মিত্রিয়াম।তাই কিছুটা সময় সকলের কাছে চেয়ে নিয়ে অলকবাবু আবার ফিরে গেলেন নিজের বাড়ির গবেষণাগারে । নিবিষ্টচিত্তে কাজ করে চলেছেন এমনই এক ঝড় জলের রাতে।লোডশেডিং হল হঠাৎ। মোমবাতিটা জ্বালাতে যাবেন ঠিক তখনি ছাদের দিকের দরজায় একটা খুট করে শব্দ শোনা গেল। মুখ তুলে ছাদের দরজাটার দিকে তাকালেন অলকবাবু আর তাকিয়েই অস্ফুটে একটা আওয়াজ করে ফেললেন।ঝড়জলের প্রেক্ষাপটে অন্ধকার ছায়ামূর্তির মত দরজা ধরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ওটা কে? চোর ডাকাত নয়ত! “ক্ক-কে ওখানে?” চেঁচিয়ে ওঠেন  মিত্রমশাই। ঠিক সে মুহূর্তে ঝলসে ওঠে বিজলী আর সে উদ্ভাসিত আলোয় পলকের জন্য দেখা যায় রহস্যময় আগন্তুকের অবয়ব।হরিপদ! এখানে এত রাতে! তার চেয়েও বড় কথা সে এলো কী করে। তাকে তো সেই কবেই হাত বেঁধে ফেলে এসেছেন স্বয়ং অলকবাবুই মিত্রিয়ামের আরোপিত নিদ্রায়।চেতনা ফিরবে কিভাবে কপালে আবার হাত না ঘষলে? অনেককিছু মেলাতে পারেন না  বিজ্ঞানী।সব গোলমাল হয়ে যেতে থাকে তাঁর। তবুও মনে মনে অনেকটা শক্তি সঞ্চয় করে জড়ানো গলায় বলে ওঠেন “তু- তুই এখানে কিভাবে এলি? মানে আমি তো…”
হা হা করে আকাশ কাঁপিয়ে অট্টহাসি করে ওঠে হরিপদ। বাজ পড়ার আওয়াজ ছাপিয়েও সে শব্দ যেন ধ্বনিত হতে থাকে অলক মিত্রর মস্তিস্কের অভ্যন্তরে দামামার মত। ঘোর লাগা অবস্থায় তিনি শুনতে পান অনেকটা দৈববাণীর মত জলদগম্ভীর কণ্ঠে হরিপদ বলে চলেছে কেটে কেটে…
“ স্যার আপনি তো আমার হাত বেঁধে রেখেছিলেন যাতে আবার কপালে হাতের ছোঁয়ায় না ফিরতে পারি এই সময়ে তাইনা? কিন্তু আপনার হয়ত খেয়াল ছিলনা আমার পা দুটো যে খোলাই ছিল। আপনি আমার কপালে ঐ পাথরটা ঠেকাতেই আমি এবার গিয়ে পৌঁছাই আরও প্রাচীনকালে বৈদিক যুগের ভারতে।জনবসতি খুবই কম সে সময়ে। চারদিকে ঘন জঙ্গল। তার পাশে ছোট ছোট জনপদ।হাত বাঁধা থাকায় খুব কষ্ট হচ্ছিল জানেন। আর আরও সমস্যা আমায় তো কেউ দেখতেও পাচ্ছিল না যে তাকে দিয়ে বাঁধনটা খুলিয়ে নেব। যাই হোক পা টা খোলা থাকায় হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পৌঁছাই এক মুনিঋষির আশ্রমে। তিনি ধ্যানমগ্ন ছিলেন। দুচোখ বোজা। সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আর ওমা দেখি তিনি কথা বলে উঠলেন আমায় দেখে- ‘হে আগন্তুক তোমার সমস্যার কি সমাধান করতে চাও?’ অথচ তাঁর ঠোঁট নড়ছিলনা এতটুকু। বুঝলাম তাঁর যোগবলের শক্তি ধরে ফেলেছে আমার সূক্ষ্ম দেহের উপস্থিতি, পড়ে ফেলেছে আমার চিন্তাতরঙ্গের গতিবিধি। উপলব্ধি করলাম আমাদের গর্বের দেশের প্রাচীন কালের হারিয়ে যাওয়া মনীষীরা এমন কিছু বিদ্যা জানতেন যার কণামাত্রও এখন আর জানা নেই কারো। পশ্চিমা দেশের বিদ্যে বুদ্ধি ধার করে আজকাল চলতে হচ্ছে আমাদের এমনি দুর্দশা। যাইহোক আমিও বললাম সব খুলে। আপনাকে যা যা বলেছিলাম সবটাই। একবার মনেও হল যে আগে কেন এই মানুষটার সাথে দেখা হলনা আমার। তাহলে তো আর আপনাকে বিশ্বাস করে ঠকতে হতনা বলুন? হা হা! যাই হোক, যোগীবাবা যা বললেন তা হল আমি যদি কোনভাবে নিজের সূক্ষ্ম স্বত্বাটিকে ওনার পবিত্র হোমানলে আহুতি দিতে পারি তাহলে এই দশার মুক্তি ঘটবে আমার আত্মার অর্থাৎ সে মুক্ত হয়ে যাবে দেশ কালের সীমানা থেকে, তারপর আমার যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারব। হয়তো নিজের পুরনো দেহটায় আর ফিরে যেতে পারবনা কিন্তু এটাই বা কম কী বলুন? তাই কথামত কাজ করলাম ওনার।  চোখ বন্ধ করে একটা মোক্ষম ঝাঁপ জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে আহ! ঐ জাদুপাথরের স্পর্শ ছাড়াই মুক্তি পেলাম। আর পেয়েই ছুটে চলে এসেছি আপনার কাছে। জানেনই তো আমি আপনাকে ছাড়া আর কাউকে তেমন পছন্দ করতাম না। কার কাছেই বা যাব বলুন? তবে একটা কথা, আমি তো এখন মুক্ত। কিন্তু আপনি দেখুন ঐ এক হতচ্ছাড়া পাথরের চক্করে পড়ে কেমন রাতের ঘুম টুম সব জলাঞ্জলি দিয়েছেন। আপনার দশা দেখেও আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। তাই ঠিক করলাম আপনাকেও একটু মুক্তির স্বাদ দিই কেমন? দেখুন ঐ জিনিসটা বড্ড সর্বনেশে, ভেবে দেখলাম আমার মাথায় এসব পরীক্ষা টরীক্ষার ভূত না চাপলে দিব্যি মলম বেচে টেনেটুনে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যেত।সাধে কী আর বলে ‘খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হল তার এঁড়ে গরু কিনে’! কি যে দুর্বুদ্ধি চেপেছিল ছাই। আসুন এদিকে…”
বলতে বলতে এক পা এক পা করে দুহাত প্রসারিত করে এগোতে থাকে হরিপদ, নাকি তার মুক্ত আত্মা! অলকবাবু বুঝতে পারেন ভয়ে পিছোতে পিছোতে তিনি প্রায় নিচু পাঁচিল দেওয়া ছাদের কোণার দিকে চলে এসেছেন আর তাঁর মৃত্যুদূত মাত্র কয়েক ফুটের ব্যবধানে। এগিয়ে আসছে আরো—আরো।চিৎকার করে ওঠেন সভয়ে – “না না হরিপদ আমায় মেরো না প্লিজ। আমি ক্ষমা চাইছি, ক্ষমা! দোহাই আমায় ক্ষমা করে দাও ভাই।
আমি চাইনি ওটা করতে।আমি বলব সবাইকে দেখো, যে ওটা তোমারই আবিষ্কার আমার নয়। আমি তো শুধু… না- না আর এগিও না…”.
[কিশোর ভারতী রহস্য-অলৌকিক গল্প প্রতিযোগিতায় ৩য় পুরস্কার প্রাপ্ত, প্রকাশিত মার্চ‌ ২০১৫] / ছবিঃ সুদীপ্ত মণ্ডল


এ কেস অফ কেশ

সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

img_209241205792789

দেশলাই বাক্সটা ফেরত দিয়ে বঙ্কু একগাল হেসে বলল, ‘বহুৎ খুবসুরৎ!’ তাগড়াই টেকো গুঁফো লোকটা স্তম্ভিত।তার চোখ তখন কপাল ছাড়িয়ে টাকের দিকে…বঙ্কুর দৃষ্টি অনুসরণ ক’রে। নিজের হতকুচ্ছিত মরুভূমির মত টাকটা যে কারো সুন্দর বলে মনে হতে পারে এ ধারণা তার কস্মিনকালেও ছিলনা। এই টাকের জন্য কতনা বিড়ম্বনা সইতে হয়েছে তাকে।প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাবার পর শ্বাশুড়ীমা জামাইকে বেয়াই ভেবে প্রণাম করতে যাচ্ছিলেন আরেকটু হলেই, আসলে বিয়ের দিন টোপর মাথায় বরবেশে তাকে দেখার কয়েকদিন পর ঐ টাক দেখাটা একটা বড়সড় ধাক্কার মতোই ছিল বেশ।ভুলটা বুঝতে পারার পর লজ্জিত হবার বদলে তিনি প্রায় অজ্ঞান হয়ে যান।নিজের ছেলের ক্লাসের বিচ্ছু বাচ্চাগুলো তাকে আঙ্কেল না বলে দাদু বলে। আবার বাসে টাসে উঠলে তড়িঘড়ি লোকজন উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সিনিয়র সিটিজেন সিটে বসতে দেয়।আর আজ এই ছেলেটা বলে কিনা খুবসুরৎ! চোখে ছানি টানি পড়েনি তো এই বয়েসে? কে জানে! তা বঙ্কুকে দেখে অবশ্য অসুস্থতার লক্ষণ কিছু চোখে পড়ছেনা। ধীরেসুস্থে দেশলাই দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে টাক থেকে চোখ না সরিয়ে আবার সে বলে ওঠে “সত্যি একদম পারফেক্ট! অসাধারণ মশাই।আপনার নামটা আরেকবার বলবেন কাইন্ডলি”?
-“ পরিতোষ মণ্ডল। কিন্তু ব্যপারটা একটু… মানে”।
-“থ্যাংকইউ পরিতোষ বাবু। সব বলছি নো টেনশন”।

-“না মানে যেভাবে আপনি তখন থেকে আমায় দেখছেন বাসস্টপে দাঁড়িয়ে, আবার আমার টাক নিয়ে…”
-“উঁহু! টাক নয়,টাক নয় বলুন ইন্দ্রলুপ্ত। আমি বঙ্কুবিহারী দাস। আমার কোম্পানির নাম ইন্দ্রলুপ্ত এন্টারপ্রাইজ। আমরা দেশী ও বিদেশী নানা প্রকার I.L হোল্ডার দের মানে ইন্দ্রলুপ্ত ধারীদের নিয়ে একটা সংগঠন গড়ে তুলেছি। বিশ্বে প্রথমবার। যার I.L সবচেয়ে নিখুঁত মসৃণ ও চকচকে এবং স্বাভাবিক, তাকে প্রতিবছর আমরা I.L STAR OF THE YEAR পুরস্কার দিয়ে থাকি বিগত ৩ বছর ধরে”।

-“কিন্তু…মানে এটার কারণ কী? আমি এখনো বুঝতে পারছিনা ঠিক বঙ্কুবাবু! আপনাদের লাভ কী এতে”।
-“আরে একটু ধৈর্য্য ধরুন বলবো সব। লাভের কী শেষ আছে? ধরুন কোন উইগ কোম্পানি তাদের মডেল চায় এমন একজনকে যার মাথায় একটিও চুল নেই। ছবি তুলে কাগজে ছাপবে উইগ পড়ার আগে ও পরে কি পার্থক্য। আমাদের সংস্থা এইসব কোম্পানিকে  I.L HOLDER সাপ্লাই করে থাকে এবং বিনিময়ে কমিশন পেয়ে থাকে।কিম্বা ধরুন বিশ্বজুড়ে কয়েকশো বিজ্ঞানী যারা এখনো অকালে চুল উঠে যাবার কারণ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন তাদের জন্য আদর্শ স্যাম্পেল জোগান দি এমন কত কী”!

পরিতোষ বাবুর মুখের হাঁ’টা ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। এসব সত্যি? যা শুনছেন? নাকি স্বপ্ন! নিশ্চিত হতে নিজের পাকানো গোঁফে জোরে মোচড় দিয়ে “উরেব্বাবা” বলে আরেকটু হলেই লাফিয়ে উঠছিলেন।

-“ আর তাছাড়া আরেকটা কাজও করি আমরা। সমীক্ষায় দেখা গেছে শতকরা ৮০ শতাংশ মানুষ তাঁদের কেশহীন মস্তক নিয়ে বেশ গভীর চিন্তায় থাকেন। আর চিন্তা নয়।বরং তথাকথিত টেকো লোকেরা সমাজে কি বিপুল খ্যাতি সম্মান ও প্রতিপত্তি নিয়ে থাকেন, তা অনেক ঝাঁকড়া চুলো ব্যক্তি কল্পনাই করতে পারেননা।ভাবুন চলচ্চিত্রের বিখ্যাত সব অভিনেতাদের অনুপম খের, অমরীশ পুরী বা ক্রিকেটার হারশেল গিবস,ফুটবলার রোনাল্ডো থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে দেখুন”।
পরিতোষবাবু যত শুনছেন ততই উৎসাহী হচ্ছেন।বললেন “তারপর? আরও বলুন। ভাল লাগছে শুনতে। বেশ একটা ইয়ে ইয়ে পাচ্ছি ভিতরে”।
-“হ্যাঁ আত্মবিশ্বাস তো? সেটাই তো আসল।তারপরে আরও সুবিধা আছে টাকের।দেখুন যাদের চুল আছে তাদের একটা রেকারিং খরচ হল প্রতি মাসে নিয়ম করে চুল কাটা, তার উপর খুস্কি, উকুনের বিতিকিচ্ছিরি সব সমস্যা, তার জন্য ডাক্তার বদ্যি ওষুধ শ্যাম্পু আর আপনাদের দেখুন, নো খরচ, নো টেনশন। বিন্দাস”!
বঙ্কুর মুখে আবার টাক শব্দটা শুনে একটু খচ করে উঠলেও আমল দিলেন না পরিতোষবাবু।আরও উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “তাই তো তাই তো! সত্যি এভাবে তো ভেবেই দেখিনি!আপনি মশাই জিনিয়াস”!
-“তাহলে আমাদের কোম্পানির এ্যাসোসিয়েশনে যোগ দিচ্ছেন তো আপনি”?
-“বিলক্ষণ! কি নিয়ম বলুন আমি এখনি যোগ দিতে চাই।এমন সুযোগ বারবার আসে না জীবনে”।
-“নিশ্চয়ই।খুব সহজ নিয়ম।এই যে এই ফর্মটায় একটু সই করে দিন।নিয়মাবলী পড়ে নিন,আর অগ্রিম পাঁচশ টাকা”।
মন্ত্রমুগ্ধের মত পরিতোষবাবু বাড়িয়ে দেন সহাস্য গান্ধীজির ছবি আঁকা কাগজটি বঙ্কুর দিকে।
বঙ্কু কালবিলম্ব না করে মুচকি হেসে টুক করে উঠে পড়ে সামনে দাঁড়ানো ট্যাক্সিতে আর বলে “চলে আসবেন কাল বিকেল পাঁচটায় আমাদের অফিসে। অপেক্ষা করব”।
সমস্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে আর বঙ্কুর ব্যাক্তিত্ব আর বাকচাতুর্যের মুগ্ধতায় পরিতোষবাবু ফর্মের কাগজটায় চোখ বোলাননি আগে ভাল করে। এবার পড়তে শুরু করলেন আর কিছুটা পড়ার পর তাঁর চোখেমুখে একটা ভয় বিস্ময় মেশানো এমন ভাব ফুটে উঠল যেটাকে এক কোথায় প্রকাশ করা যাবেনা। কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা ধরে বসে পড়লেন ফুটপাথেই। আলগা হয়ে খসে পড়ল পাঁচশ টাকার বিনিময়ে পাওয়া ফর্মটা যাতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হরফে লেখা —“আপনার মত যাদের ভগবান মাথা এবং মগজ দু’জায়গাতেই বস্তু কম দিয়েছেন তাঁদের জানাই শুভেচ্ছা আর প্রাণভরা অভিনন্দন। টাকে মাটি মাটি টাকা – টাকে মাটি মাটি টাকা-টাকে মাটি মাটি টাকা – টাকে মাটি মাটি টাকা-…”। আর পড়তে পারলেন না পরিতোষবাবু।ঝিমঝিম করে উঠল চুলবিহীন মাথা। শুধু অচৈতন্য হবার আগে ঝাপসা চোখে অফিসের ঠিকানার জায়গায় দেখলেন লেখা আছে, “ টাকেশীজ ক্যাসল, টাকী, পোষ্ট অফিস-টাকপাড়া”।
তলায় তারা চিহ্ন দিয়ে লেখা “ * * * টাকের যত্ন নিন”।

[প্রকাশিতঃ কিশোর ভারতী,মে,2015ঃ বইমেলা instant গল্প প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত] / ছবিঃ তৌসিফ হক

মেয়েলি
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

বাবলু ছোট থেকেই একটু অন্যরকম।সেটা যখন তার আশেপাশের লোক,বন্ধু-বান্ধবদের নজরে পড়ল তারা বেশ একটা আমোদের বিষয় পেল। যত বড় হতে থাকল ততই তার মেয়েলি কথার ঢং, আচার আচরণ ও হাঁটা চলার ভঙ্গী প্রকট হয়ে উঠল। ক্রমে তাকে দেখতে পেলে টোন টিটকিরি ও ইয়ার্কির মাত্রা এমন লাগামছাড়া হয়ে উঠল যে বাবলুর পক্ষে সহজভাবে সেগুলো হজম করে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।খুব প্রয়োজন না পড়লে সে পারতপক্ষে বাড়ি থেকে বেরতই না।কিন্তু ইদানীং হঠাৎ কিছুদিন যাবৎ তাকে দেখা যাচ্ছে রোজ সকাল ৯টা হলেই বেশ ফিটফাট হয়ে সেজে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে গটগট করতে করতে কথায় যেন যায় আবার রাতেও বেশ দেরী করেই ওভাবে ফেরে। পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে আড্ডা মারা বিশু, তপন, মানিকদের চোখে ব্যাপারটা ধরা পড়তে একটু দেরী হল।কিন্তু একদিন তারা তক্কে তক্কে থেকে বাবলুকে পাকড়াও করল।“কি ব্যপার খুকি? রোজ সকালে সেজেগুজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”বাবলু আশ্চর্যজনক ভাবে ঠোঁট উল্টে “পথ ছাড়, দেরী হয়ে যাচ্ছে” ইত্যাদি বলে পাশ কাটিয়ে দিব্যি হনহনিয়ে চলে গেল দ্রুতপায়ে। বিশুরা এতে যত না বিরক্ত হল মজা করার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় তার চেয়ে বেশী অবাক ও কৌতূহলী হল । আর চমকাল বাবলুর আচরণে পরিবর্তন দেখে।যাই হোক কদিনের মধ্যে ব্যপারটা গা সওয়া হয়ে এলো অথবা বাবলুর চেয়ে অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং বিষয় নিয়ে গুলতানি করা সময়োপযোগী মনে হল।হঠাৎ একদিন ভিড় লোকাল ট্রেনে বিশু আর তপন একটা জরুরী কাজে শিয়ালদা যাবার জন্য উঠতেই খানিক বাদে কয়েকটা হিজড়ে উঠল কামরায়।যেমন ওঠে প্রায়ই।স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে হাততালি, কিছু অশ্লীল ইঙ্গিতময় কথার টুকরো ছুঁড়ে দিতে দিতে তারা হাত পাতে যাত্রীদের কাছে। যেই না বিশুর সামনে তাদের একজন হাত পেতে বলেছে “ এই বাবু…”,বিশুর সাথে চোখাচুখি হল তার, আর ওটুকু বলেই কেমন থতমত খেয়ে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিটকে সরে যেতে থাকে ভিড়ের মধ্যে।ঘটনার আকস্মিকতার প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়ে বিশু চিৎকার করে ওঠে, “তপন !ওরে ভাই তপন দেখলি? দেখলি ঐ হিজড়েটাকে? আমাদের বাবলু রে! …অ্যাই বাবলু! পালাচ্ছিস কোথায় রে ব্যাটা!ধর ধর যেন না পালায়…” ততোক্ষণে ট্রেন সোদপুরে ঢুকছে। শাড়ী পরা একটা চেহারা প্রায় লাফ দিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নামে প্ল্যাটফর্মে। হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিয়ে আবার ছুটতে চেষ্টা করে কিন্তু শাড়ীর আঁচলে আটকে পড়ে যায় সে। ইতিমধ্যে আগ্রাসী দুজন নেমে এসেছে ট্রেন থেকে, তারা ধাওয়া করতে থাকে পরিচিত লক্ষ্যবস্তুকে। বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়না। অচিরেই ধরাশায়ী বাবলুকে ঘিরে ফেলে তপন আর বিশু। কাঁদো কাঁদো মুখে সে বলে ওঠে…“প্লীজ আমায় মেরো না । কাঊকে বোলো না দোহাই”। তবে এসবে চিঁড়ে ভেজেনা। “তাহলে এই তোমার রহস্য চাঁদু। তাই ভাবি কে তোকে চাকরী দেবে।শালা দেখ আজ তোর কী হাল করি। ব্যাটা মাগী সাজা ঢ্যামনা”।দুজন মিলে টানতে টানতে নিয়ে আসে তাকে স্টেশনের কাছেই একটা ক্লাবঘরে।তপনের এক বন্ধু কার্ত্তিক ঐ ক্লাবে আড্ডা দেয় ও জানত। হাঁক পাড়ে তপন- “কাত্তিক অ্যাই কাত্তিক থাকলে শিগগীর আয় একবার এদিকে। দেখে যা একটা জিনিস”। জিনিস দেখার থাকলে লোকের অভাব হয়না কখনই। আর ভরদুপুরের অলস ক্লাবঘরে একটু সিগারেট,তাস, মদের চেয়ে আকর্ষক কিছু ‘জিনিস’ বাইরে থাকলে না বেরিয়ে পারা যায়? হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসলো কার্ত্তিক ও তার সঙ্গী সাথীরা। “আরিব্বাস এ মাল টা কে রে? পুরো ঝিঙ্কু তো। কি কেস?” অতঃপর পুরো বৃত্তান্ত খোলসা হয়। থরথর করে কাঁপতে থাকা ভয়ার্ত বাবলুকে ক্লাবঘরে ঢুকিয়ে খিল তোলা হল দরজার। আঁচল ধরে এক টান মারল কাত্তিক। “নাচ সালী!” ধমক শুনে ডুকরে উঠে ফোঁপায় বাবলু। হ্যা হ্যা করে সমবেত হাসির রোল ওঠে। “এ মাল তো পুরো মেয়ে রে। ভিতরটাও তাই নাকি দেখি দেখি”।দুর্বল হাতের বাধা কিছু করতে পারেনা। অন্তর্বাসে সেজে কাঁদতে কাঁদতে নেচে ওঠে মেয়েলি ছেলেটা। তবে তার দুর্ভোগের শেষ এখানেই ছিলনা। দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরে দাঁড় করায় তাকে হাত পিছমোড়া করে বেঁধে।একে একে তপন বিশু কার্ত্তিক সহ লাইন করে সবাই মেপে নেয় বাবলুর নারীত্ব, তার গভীরতা। তার সম্ভ্রমের শেষ সীমানা ভেঙ্গেচুরে দেয় সম্মিলিত প্রয়াসে। অবশেষে সব কিছু পুড়ে গেলে দাবানলে,ভাঙ্গাচোরা সেই রাতে রেল লাইনের ধারেই পাওয়া যায় একটি লাশ, অবশ্য লাশ হয়ে গেলে আর মাথা ব্যথা থাকেনা কারো কেউ কতটা পুরুষালি ছিল বা কতটা মেয়েলি।
[প্রকাশিতঃ আজকের অনির্বাণ]

ডাক

সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

লাশকাটা ঘর।বউটা বাড়ি ফেরেনি আজ দু’রাত হল।বারবার ফোন করছে পিঙ্কিকে।NO RESPONSE!এদিকে একটা ক্ষতবিক্ষত বেওয়ারিশ লাশ এসেছে আজ।পোষ্ট মর্টেম হয়ে গেছে।সাদা চাদর ঢাকা লাশটা কেঁপে উঠল যেন হঠাৎ।মনমরা হয়ে বসা বিরজু ডোমের তন্দ্রা ছুটে গেল এক ঝটকায়।চাদর সরায় কাঁপা হাতে।লাশের বুকের বামদিকের পাঁজরার জায়গায় একটা গভীর ক্ষত।খুবলানো মাংস,তবু ভিতর থেকে কম্পন ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমাগত। তীব্র আতঙ্কে অথচ কিরকম যেন ঘোরের মধ্যে বিরজু হাত ঢুকিয়ে দেয় ভিতরে।একটা রক্তাক্ত ভাইব্রেটিং সেলফোন।ঠিক যেখানে হৃদয় থাকে।মাঝেমাঝে কেঁপে উঠছে পরপারের ডাকে।কে জানে কে তাকে খুঁজছে এখনো! স্ক্রিনটা মুছতেই ভেসে উঠল ‘BIRJU CALLING PINKY’!

(প্রকাশিতঃতথ্যকেন্দ্র ,এপ্রিল ২০১৬)

রাতের পর
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

raterpor2

ঘুমটা আসছিলনা ভাল। আসছে আর  ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। ঝড় বৃষ্টির দিনে রেডিওর বাজে সিগন্যালের মত। এপাশ ওপাশ করল অনেকক্ষণ। তারপর উঠে জল খেলো। একবার বাথরুমে গেল। একটু ঘাম হচ্ছে। পাখাটা ফুলস্পিডেই চলছে অবশ্য। একটা গুমোট ভাব। মনে হয় কোন বাজে  দুঃস্বপ্ন দেখেছিল , মনে পড়ছেনা এখন আর।অস্থিরতা কাজ করছিল একটা রাতে খবরটা শোনার পর থেকে।একটাও ভালো খবর না। তিনটে রেপ,দুটো খুন,একটা আত্মহত্যা,একটা গণহত্যা, পশ্চিমে অনবরত যুদ্ধ, আর আফ্রিকায় অনাহার,কোথাও বন্যা বা তুষারঝড়ে প্রাণ ও সম্পত্তিহানি।পৃথিবীর কী গভীর অসুখ করেছে? বারান্দার দরজা খুলে একটা সিগারেট ধরিয়ে ব্যালকনিতে এলো সঞ্জয়। চারতলা থেকে শহরের খানিকটা দেখা যায় ভালই। রাত একটায় এখনো অনেক গুলো বাড়িতে আলো জ্বলছে । শহর এখন রাত জাগে অনেক বেশি।নীচে রাস্তা অবশ্য শুনশান বেশ। হলদেটে স্ট্রীট লাইটের আলো গড়িয়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক, সমস্ত অন্ধকার কোণ ভরাট করতে পারেনি অবশ্য। হঠাৎ আকাশের দিকে চোখ পড়তে থমকে গেল সঞ্জয়। পশ্চিম দিক থেকে কি একটা উড়ে আসছেনা? বলতে বলতেই সেই জিনিসটা মস্ত কালো ডানা মেলে ঝুপ করে নেমে এলো সটান ব্যালকনিতে।কিরকম একটা বোকা বোকা বিমূঢ় হাবভাব নিয়ে তাকাল সঞ্জয় ওটার দিকে।একটা মানুষ, না ঠিক মানুষের মত না। বড় বড় দুটো ডানা, ঠিক পাখির মত না, পতঙ্গ বা বাদুড়ের মত। রোগা শীর্ণ চেহারা, চোখ দুটো অসম্ভব জ্বলজ্বলে। টিকলো নাক ,মাথায় চুল নেই একদম।
“দেখি একটু কাউন্টার হবে নাকি?” স্থির চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল লোকটা।
“অ্যাঁ? হু-হুম, নিন-নিন না”। সিগারেট টা নির্বিবাদে বাড়িয়ে দেয় সঞ্জয়।
“অবাক হচ্ছেন? আরে মশাই এদিক দিয়ে আসছিলাম একটু কাজে, খোলা ব্যালকনি আর জ্বলন্ত অগ্নিবিন্দু দেখে একটু জিরিয়ে নিতে এলাম। কটা কাজ বাকী আছে।সেগুলো সেরে ফেলতে হবে চটপট”।
“না, মানে আমি ঠিক , মানে এরকম তো দেখিনি আগে কখনো তাই…”
“তাই ভয় পেয়ে গেছেন তো? হাহা। আরে ভয়ের কি আছে, আর কটা দিন ওয়েট করুন, আমরা ঝাঁকে ঝাঁকে ছেয়ে ফেলব এই আকাশ এই মাটি এই দুনিয়া। সেই দিন আসন্ন”।
“আপনারা, মানে? আপনারা কারা? কোথা থেকে আসছেন?”
তীব্র ভয় পেলেও আশ্চর্যজনক ভাবে সঞ্জয় খেয়াল করল ওর জ্ঞান হারাচ্ছেনা, এমনকি মনের মধ্যে খুঁচিয়ে ওঠা প্রশ্ন গুলোও করে ফেলতে পারছে অবলীলায়।
“আমরা মানে নরকবাসীরা।পৃথিবীর মধ্যেই কিছু কিছু অজ্ঞাত স্থানে আমরা শিবির ফেলে রয়েছি আপাতত । ছড়িয়ে পড়ছি নানাদিকে, কিছু কিছু অনুকূল আধার অর্থাৎ মানুষকেও আমরা কাজের সুবিধার্থে ব্যবহার করছি। দেখছেন তো তার প্রভাব নিশ্চয়ই?নরকের সাম্রাজ্যবাদী পলিসি আস্তে আস্তে পৃথিবীর সব কটা দেশ প্রদেশ রাজ্য গ্রাস করে নেওয়া।”
সঞ্জয়ের হাঁ টা আরও বড় হয়ে যায়, অস্ফুটে শুধু বলতে পারল “ওহ!”
“ এই যেমন ধরুন রেপ। আগে মাসে একটা কি দুটো শোনা যেত ক্বচিৎ কদাচিৎ। আর এখন ? সাত থেকে সত্তর কোন মেয়ে বাদ যাচ্ছেনা। মেয়ে হলেই হল। রেপটাকে জন্মগত অধিকার বানিয়ে ছাড়ছে মর্ত্যবাসীরা হাহা! আমরাই লজ্জা পেয়ে যাচ্ছি মাঝে মাঝে বুঝলেন! কি প্রতিভাবান ছেলে সব, দুধের দাঁত পড়েছে কি পড়েনি বিষদাঁত গজিয়ে যাচ্ছে!মায়ের কোল থেকে নেমেই অন্য কোন মায়ের সর্বনাশে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠছে।”
সঞ্জয় নিরুত্তর। লোকটা বলে চলে “ বা ধরুন ধর্মযুদ্ধ। এই একটা অজুহাতে কতগুলো ভেড়ার দলের মত মানুষকে জবাই করে দেওয়া যাচ্ছে।আর বাকিগুলো ভয়ে থরথরিয়ে কাঁপছে। হেব্বি আনন্দ হয় যখন মুণ্ডুগুলো কচাত করে কাটে বা ঝাঁজরা হয়ে যায় পাঁজরাগুলো দুর্বল দু’পেয়ে গুলোর। আর সেগুলোর চলমান দৃশ্যও তো ছড়িয়ে পড়ছে এখন চারদিকে কী অনায়াসে।কেউ বেশি বাড়াবাড়ি করলেই চুপ!”
সঞ্জয় বিড়বিড় করে ওঠে “তার মানে এগুলো সব আপনাদের কাজ?”
“না না কেবল আমরা নই, আমরা তো শুধু উস্কানিটুকু দিতে পারি, মানুষ সেই মত চলে।বেশির ভাগ ক্রেডিট মর্ত্যবাসীরই। কিন্তু ইদানীং ইম্প্রুভমেন্টটা অসাধারণ হচ্ছে বুঝলেন। মাঝে মাঝে তো মনে হচ্ছে আমাদের ছেলে মেয়েদেরও মানে নরকবাসীকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে এরা। গুজরাতে তো দেখেছিলেন কেমন সাড়া ফেলে দিয়েছিলাম? ওখানে বেশ কিছু ক্যাম্প ছিল আমাদের।পাশের বাংলাদেশে দারুণ সাফল্য পাচ্ছে আমাদের ছেলেরা। খুব অ্যাক্টিভ।তারপর এই যে কদিন আগে কেনিয়াতে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে আমাদের কিছু অনুরাগী বন্দুক বাগিয়ে আগে জিজ্ঞেস করল বল তোরা কে কোন ধর্মের। যেই অন্য নাম বলছে ওমনি পটাপট গুলি। হাহা। কি মজার না?”
সঞ্জয় বলল “মজা? সেটা কিকরে আসে এসবে, আর কেনই বা সেটাই ঠিক বুঝিনা”।
“হ্যাঁ বোঝেন না বলেই তো সুবিধা। আসতে আস্তে আস্তে এগুলো সইয়ে নেওয়াবো আপনাদের।সহ্য ক্ষমতা বাড়িয়ে দিচ্ছি একটু একটু করে। এখন দেখবেন সাধারণ চুরি ডাকাতি বা জালিয়াতির ঘটনায় কেউ তেমন মাথা ঘামায় না। রাস্তায় চোখের সামনে কারো গলার হার, হাতের মোবাইল ছিনিয়ে পালালেও কেউ ফিরে তাকাবেনা। অভ্যাস মশাই। সবই অভ্যাস। “
সঞ্জয় চমকে ওঠে। আরে তাইতো! পরশু অফিস যাবার সময় ঠিক এরকমই একটা ঘটনা দেখলনা? এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক হাউহাউ করে কাঁদছিলেন রাস্তায় বসে পড়ে। আমার মেয়ের বিয়ের গয়না, এত টাকা সব নিয়ে গেল। হায় হায়। ব্যাঙ্কের সামনে ফুটপাথে বসে। অদূরে একটা পুলিশ বন্দুক নিয়ে নির্বিকারে দাঁড়িয়ে।ফুটপাথ দিয়ে কত লোক পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হনহনিয়ে। আরও দূরে তখনো দেখা যাচ্ছে মোটর বাইক আরোহী মুখে কালো কাপড় ঢাকা তিনটি ছেলে শূন্যে পিস্তল থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে চলে যাচ্ছে, একজনের হাতে ঢাউস সুটকেস একটা। নির্ঘাত বুড়োটার। একবার ভাবল পুলিশটা কে ডেকে জিজ্ঞেস করে ভাই একটু চেষ্টা করলে কি ছেলে গুলোকে ধরা যেতনা? পরক্ষনেই কানের কাছে জোরে হর্ন দিয়ে ওঠে বাসটা, হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে চটপট উঠে পড়ে অঞ্জন অফিস অভিমুখে। পিছনে আর তাকানো হয়নি।কিন্তু ভিতরে একটা খচখচানি রয়েই গেছিল সেটা টের পেয়ে এখন তার অবাক হল সঞ্জয়। এদিকে বাদুড় মানুষ নাকি বাদুড় নরকবাসীটা তখনো গদগদ কণ্ঠে বলে চলেছে
“কয়েকজনকে ছোটোবয়েসেই টার্গেট করছি আমরা।নতুন ধরণের ড্রাগ,কাঁচা পয়সার লোভ,একটু দাদাগিরি করার বাসনাকে টুক করে উস্কে দেওয়া, ব্যাস! টুকলি ছাড়া পরীক্ষা দেবেনা, মাষ্টাররা দুটো মারলে ওরা চারটে মারবে,ফুর্তি করে তারপর একদিন মা বাবা কে লাথি মেরে ভাগাবে।এগুলোকে হাল ফ্যাশন হিসেবে প্রোমোট করা হবে দেখবেন কিছু দিনের মধ্যেই।তারপর ঐ যে ফ্রান্সে একটা আপিসে বসে কটা লোক রঙ তুলি নিয়ে বিপ্লব করবে ভেবেছিল।সামান্য একটা খবরের কাগজের এত দম?মাত্র দুজন ছিল আমাদের। দিয়েছে সব কটাকে নিকেশ করে। হিহি!”
আর পারলনা সঞ্জয় সহ্য করতে-“কিন্তু তাও তো থামছেনা প্রতিবাদ দেখছেন সেটা? কেউ না কেউ তো শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াচ্ছেই। তফাত কিন্তু আছে এখনো”।
প্রিয় কবির লাইন যেটা মনের মধ্যে সর্বক্ষণ ঘুরপাক খায় সেটা এই মুহূর্তে প্রয়োগ করল সঞ্জয়। আর মনে মনে একটু বল ফিরে পেল যেন।
“ হুহ! শিরদাঁড়া! করাচ্ছি সোজা। সব কটা কে দেখে নেব আমরা দেখবেন। আমরা সংখ্যায় বাড়ছি ভুলে যাবেন না”।
যদিও বলছে এসব তবু শেষ কথাগুলো শুনে সঞ্জয়ের মনে হয় একটু যেন নার্ভাস দেখাচ্ছে লোকটাকে । বলে ওঠে সে -“ দেখুন যতই বাড়াবাড়ি করুন, দু’একজন দিয়ে শুরু হবে হয়তো, মরবেও, কিন্তু শেষে দেখবেন আপনাদের অস্ত্র শেষ, আপনারাও শেষ , আর পৃথিবী ঘুরে গেছে আবার আলোর দিকে। দেখুন তো এই লাইন দুটো শুনতে কেমন লাগে –
‘অতও নির্লজ্জ নয় মাথার বাসনা,
কাটা গেলে যাবে, তবু নোয়াতে পারবনা’”।
লোকটা চকিতে ফিরে তাকায় তেমনি জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে। “ওহ! বটে”?
সিগারেটটা মুখ থেকে ফেলে পায়ের তলায় পিষল লোকটা। তারপর তখনো অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা সঞ্জয়ের দিকে একটা বিষাক্ত চাহনি হেনে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই। পূব দিগন্তে লালের পূর্বাভাস তখন। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সঞ্জয় ঢুকল ঘরে। ঘড়িতে সাড়ে চারটে বাজছে। বালিশে ফের মাথা রেখে ভাবল রাতের পর এখনো সকাল হচ্ছে অন্তত এটা একটা ভালো লক্ষণ। রোদ্দুরে ভরে যাবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই।কিন্তু ভোর সময়টা যে ভালো ঘুমের ওষুধ এটা কে না জানে।বালিশটা আঁকড়ে একটু শান্তির খোঁজে চোখ বুজল  সঞ্জয়।

[প্রকাশিত ঃ নিরুক্ত পত্রিকা,২০১৫]

ভূতচরিত
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

“মানুষ মরলে ভূত হয়। পশুপাখি মরলেও হয় নিশ্চয়ই।যাবতীয় জড়বস্তু প্রাণহীন অতএব ভূত হবার প্রশ্ন নেই। ভূত প্রধানতঃ গ্যাসীয় পদার্থ, যদিও এর আচার আচরণ বিবেচনা করে একে অপদার্থও বলা চলে। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে কঙ্কাল অর্থাৎ কঠিনরূপে, জলজ অর্থাৎ তরল ভূত এবং অত্যাধুনিক প্লাজমা ভূত ও দেখা গেছে। কিন্তু এইসব অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কোন বিশেষ নিয়ম বা নীতি আছে বলে জানা নেই।ভূতের ছায়া পড়েনা এমনটা জানা গেছে। যেহেতু আলোর সাথে ভূতের সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক এবং তুল্য সম্পর্ক আলো-অন্ধকারের মধ্যেও, অতএব ভূত একপ্রকার অন্ধকার”। ..টেবিলল্যাম্পের আলোয় এই পর্যন্ত লিখে একটু কলম থামালেন যুক্তিবাদী লেখক প্রিয়াংশু রায়।নিজের লম্বা ছায়াটাকে হঠাৎ দেওয়ালে খুঁজে না পেয়ে একটু উৎকণ্ঠিত হলেন।সাধারণতঃ ছায়ারা মানুষের অনুসরণ করে, এখানে ব্যপারটা উল্টো ঘটায় কিছুটা বিস্মিত ও বিরক্ত হলেন তিনি।তবে ভয় পান নি মোটেও, ভয় পাওয়াটা ঠিক সম্মানজনক ব্যপার নয়।তাছাড়া সমাজে বেশ ডাকাবুকো ও সাহসী বলে নামডাক আছে তাঁর।কলেজে পড়ার সময়ে বন্ধুদের সাথে চ্যালেঞ্জ লড়ে ফিঙ্গেপাড়ার শ্মশানে একা রাত কাটিয়ে একশ’ টাকা বাজি জিতেছিলেন। এমনকি মাথায় বিরাট কালো হাঁড়ি এঁটে গায়ে কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ভয় দেখাতে আসা নোলেকে শ্মশানের চিতা থেকে তোলা পোড়া চ্যালাকাঠ নিয়ে এমন তাড়া করেছিলেন যে বেচারা শীতের রাত্রে পালাতে গিয়ে পা ফসকে গঙ্গায় পড়ে তারপর সাতদিন ধরে কলেজের ক্লাসেও হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো করেছিল।তারপর ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় হোস্টেলের সেই ভূতুড়ে কাণ্ড।তেতলার একটা ঘর সবসময় তালাবন্ধই থাকত।পরীক্ষার আগে প্রিয়াংশু একটু একা একা না পড়লে মনঃসংযোগের খুব অভাব বোধ করত,অথচ ঘরে বন্ধুদের রাত ১২টা অবধি হইহট্টগোলের ঠেলায় তার জো নেই। এদিকে যেই সে বলল আমি ওদিকের বন্ধ ঘরটা খুলে একটু পড়ি বরং, সবাই একবাক্যে হাঁ হাঁ করে উঠে মানা করল। কারণ জানতে চাইলে বলল, ঐ ঘরে নাকি একবার এক ছাত্র ডিপ্রেশনে ভুগে আত্মহত্যা করেছিল গলায় দড়ি দিয়ে। সেই থেকে ঐ ঘরটা ভূতুড়ে।রাতে নানারকম আওয়াজ হয়।এমনকি কেউ কেউ নাকি শূন্যে ঝুলন্ত দড়িও দেখেছে সিলিং থেকে নেমে আসতে। অনেকবার কমপ্লেন পেয়ে ওটা কর্তৃপক্ষ তালা মেরে দিয়েছে। সবাই জানে। প্রিয়াংশু বেশী পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে বলে জানতোনা।যাই হোক, সে রাতে ওটা শুনে আরও জেদ বেড়ে যায় তার।দারোয়ানকে অনেক বলে কয়ে কুড়িটাকা ঘুষ দিয়ে তালা খোলায় সেই ঘরের।মাকড়শার জাল,ধুলো টুলো ঝেড়ে সাফসুতরো করে নিরিবিলিতে পড়ে অনেকক্ষণ। তারপর ঐ ঘরেই ঘুমায় সেই রাতে।গভীর রাতে একটা খুটখাট অস্বস্তিকর আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে যায়।খাটের তলায় কিছু নড়ছে মনে হয়,একই সাথে ছাদের উপরেও কি একটা সড়সড় আওয়াজ। আর কি আশ্চর্য জানলা দিয়ে আসা আবছা আলোতে সিলিং এর দিকে চাইতে দেখা গেল সরু দড়ির মত কি একটা দুলছে অল্প অল্প। অন্য যে কেউ হলে এই পরিস্থিতিতে নির্ঘাত দৌড়ে পালাত ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে,কিন্তু আগেই বলেছি প্রিয়াংশু আলাদা মানুষ।সে ধীরেসুস্থে উঠে আলো জ্বালতে গিয়ে দেখল লোডশেডিং।তাতেও দমল না,বালিশের তলা থেকে টর্চটা বের করে সিলিঙে ফেলল সোজা। দেখল সিলিং ফ্যানের ঝোলার জায়গাটা ফাঁকা, কিন্তু কোন এক সময় সেটা ছিল। কানেকশনের একটা পুরনো তার লাট খাচ্ছে হাওয়ায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটু গেড়ে মেঝেয় বসে চৌকির নীচে চালিয়ে দিল আলোকরশ্মি।সাথে সাথে সেটা গিয়ে পড়ল জ্বলজ্বলে দুটো চোখের উপর। এক নিমেষে লম্বা লেজটা তুলে পুরনো টিনের বাক্সগুলোর ফাঁকে গিয়ে সেঁধিয়ে গেল ধেড়ে ইঁদুরটা।মুচকি হেসে এবার আবার মাথা তুলে তাকাল প্রিয়াংশু সিলিঙের দিকে।সড়সড়, মাঝেমাঝে হালকা ধুপধাপ আওয়াজ হয়ে চলেছে ছাদের উপর।ছাদের দরজাও রাতে বন্ধ হয়ে যায় দশটার পর।এখন বাজে রাত একটা।তাহলে?পা টিপে টিপে ছাদের সিঁড়ির কাছে এসে প্রিয়াংশু দেখল অনুমান সত্যি।দরজার সামনে একটা টুলে বসে  ঝিমোচ্ছে দারোয়ান।কিন্তু দরজা টা বন্ধ নয়,ভেজানো।আস্তে গলা খাঁকারি দিতেই চমকে উঠে যেন ভূত দেখল দারোয়ানজি। ইশারা করতেই চুপচাপ খুলে দিল দরজাটা।যা দেখার দেখে নিয়ে যখন নিশ্চিন্তমনে ফিরে যাচ্ছে প্রিয়, সেসময় হাতদুটো চেপে ধরে রীতিমত কাকুতিমিনতি করে বলল দারোয়ান “দয়া করে হস্টেল সুপারকে বলবেননা বাবু,আমি গরিব মানুষ। দুটো পয়সার লোভে ওদের কথা মানতে বাধ্য হয়েছি।হোস্টেলের এই ছেলেগুলো ভাল নয় জানি।সেজন্যই আরও ভয়।ওরা বলল মাঝেমধ্যে রাতে নিজেরা বসে একটু আধটু সিগারেট আর পানীয় টানীয় খাবে,তাস ও খেলবে।আর ছাদের ঐ দিক টাতেই বসে যার নীচে ঐ ভূতুড়ে ঘর। ফলে দুটো কাজ হয় একসাথে, নিচের ঘরে কেউ থাকতেও ভয় পায় আবার থাকেনা বলে ওরাও নির্বিঘ্নে আড্ডা দেয়।আপনার মত সাহসী কেউ আসবে আর জেনে যাবে এটা চিন্তায় আসে নি।দয়া করে জানাবেন না উপরমহলে!” লোকটার কথায় মায়া হয়েছিল প্রিয়র। সে বন্ধুদেরও বলেনি। একদম চেপে গেছিল। শুধু সকালে হাসিমুখে ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে বলেছিল ওসব ভূত টুত বোগাস। কিসস্যু নেই। এতে অবশ্য ঐ তালাবন্ধ ঘর সম্পর্কে ভয় ভীতি খুব একটা দূর হয়েছিল কিনা জানা নেই, তবে সাহসী হিসেবে যুবক প্রিয়াংশু বেশ সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পেরেছিল বন্ধুমহলে।ভূতের সাথে প্রিয়াংশু বাবুর কেমন একটা অলিখিত আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক যেন।ভূতের অস্তিত্ব না মানাই শুধু নয়,বিশ্বের যেখানে যত রহস্যময় আর ভূতুড়ে কারবার কাণ্ডকারখানার খোঁজ পাওয়া যায় তিনি যেচে সেখানে গিয়ে যেভাবেই হোক প্রমাণ করে  আসেন ভূত বলে কিছু নেই।ঠিক কবে থেকে তাঁর এই ভূতবিরোধিতার সূত্রপাত সেটা ঠিক জানা যায়না অবশ্য।তা এহেন মানুষটা যখন দেখলেন পায়ের নীচে থাকা আজন্মকালের সঙ্গী ছায়াটা জায়গা বদল করেছে তখন বেশ বিরক্ত হলেন। এদিক ওদিক তাকিয়ে অবশেষে সেটাকে দেখতে পেলেন দরজার পাশে দেওয়ালে আটকে আছে চুপচাপ। খুব একটা চুপচাপ ও নয়, নড়ছে অল্প অল্প। এবং সেটাও তার নিজের ইচ্ছেমতই, প্রিয়াংশু বাবুর নড়াচড়া সেটা ফলো করছেনা একদমই।বিরক্তিসূচক একটা শব্দ বেরিয়ে এলো তাঁর মুখ থেকে “আঃ!” ব্যস এক মুহূর্ত। তারপর ছায়াটা আরও বাড়াবাড়ি করল। সুড়ুৎ করে একদম দরজার ওপাশে গিয়ে সেঁধিয়ে গেল।আর মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলেন না এই বেয়াদপি দেখে। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।এবং একটা চমক খেলেন যখন দরজার পাল্লাটা সরিয়ে কিছুই দেখতে পেলেন না।কিন্তু তিনি দমবার পাত্র নন। তাঁর এখনো মনে হচ্ছে এটা কারো না কারো চালাকি।তাঁর শত্রু নয় নয় করে কম হয়নি এইসব ভূত প্রেতের বুজরুকি প্রমাণ করতে গিয়ে। কত তান্ত্রিক জ্যোতিষীর বাজার নষ্ট হয়েছে ইয়ত্তা নেই, কত ওঝা গুণিন নিজেদের পেশা ত্যাগ করে চাষি-বাসী হয়ে গেছে তারও লেখাজোখা নেই।কত সমাজবিরোধীর হানাবাড়ির ভয় দেখিয়ে করে খাওয়া ব্যবসা লাটে উঠেছে বা কত শ্মশান,কবরখানা,গোরস্থান প্রিয়াংশু বাবুর পান্থনিবাসে পরিণত হয়েছে নিজেদের গা ছমছমে পরিবেশের বদনাম রটিয়ে সেসব ও হিসেবের বাইরে। তাই বিজ্ঞানের সেইসব শত্রুরা যে একজোট হয়ে কোন না কোনদিন তাঁকে বেকায়দায় ফেলে মজা লুটবার প্ল্যান করতেই পারে এ ব্যপারে প্রিয়াংশুবাবু একপ্রকার নিশ্চিত।তাই গজগজ করতে করতে ছায়ারহস্য উদ্ধার করতে দরজা খুলে ঘরের বাইরে লম্বা দোতলার করিডরে বেরিয়ে এলেন।বাল্ব জ্বলছে একটা, ছায়া পড়ার কথা দেওয়ালে,নেই।ছায়াটাকে এখানেও না দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন একটা। আজ প্রিয়াংশুবাবু বাড়িতে একদম একা।ছেলেকে নিয়ে স্ত্রী গেছে বাপের বাড়ি,ফিরবে আগামীকাল।কাজের মাসিও সকাল সকাল বাসন মেজে ঘর সাফসুতরো করে চলে গেছে। তারপর সেই সন্ধ্যে থেকে বসেছেন নিজের লেখার টেবিলে ভূত বিষয়ক প্রবন্ধটি লিখতে।একটি নামকরা পাক্ষিক তাদের প্রচ্ছদকাহিনীর জন্য অনুরোধ করেছে ভূত নিয়ে বেশ একটা গবেষণামূলক লেখা দিতেই হবে তাঁকে।যাতে বিশ্বাস-অবিশ্বাস,বিশ্লেষণ,যুক্তির দ্বারা সত্যের উন্মোচন সবই থাকবে। অতএব বেশ আঁট ঘাট বেঁধেই লিখছিলেন মন দিয়ে।কিন্তু তার আর জো নেই। এইসব উটকো ঝামেলা পোষায়?করিডরে দাঁড়িয়ে ভাবেন প্রিয়াংশু রায়। এমনিতে একা একমনে কাজ করার সুযোগ পেয়ে খুশিই ছিলেন তিনি,তবে এখন কেন যেন মনে হচ্ছে কেউ থাকলে বোধহয় ভাল হত।কিন্তু থাকলে কেন, বরং মনে হচ্ছে কেউ যেন আছে! আর এই ভাবনাটা আরও অস্বস্তিকর।মনে হচ্ছে ঘাড়ের পিছনেই কেউ দাঁড়িয়ে আছে, তার নিঃশব্দ নিশ্বাস পড়ছে মৃদু মৃদু,এক ঝটকায় মাথা ঘুরিয়ে যখন দেখলেন ফাঁকা সবকিছু,অজান্তে কেঁপে উঠলেন কি একটু অকুতোভয় প্রিয়াংশু রায়? দম নিলেন জোরে জোরে দুবার।মনকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন,কেউ নেই, কেউ থাকতে পারেনা।কিন্তু তবু বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল কোন অজানা আশঙ্কায়।ভূতে বিশ্বাস না থাকলেও ভূত নিয়ে যাবতীয় নামীদামী লেখকদের লেখা পড়ে ফেলা, ভূতের ছবি সব প্রায় দেখে ফেলার সুবাদে এই তথ্যটুকু তাঁর অজানা নয় যে একমাত্র মৃত মানুষেরই ছায়া পড়েনা, যখন তারা প্রেতরূপে বিচরণ করে মর্ত্যে।অথচ তিনি তো দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন।এই খটকা টাই তাঁকে ভিতরে ভিতরে অস্থির করে তুলল।হঠাৎ কি একটা মনে পড়ায় হুড়মুড়িয়ে এগোলেন বাথরুমের দিকে। দেওয়াল জোড়া একটা আয়না আছে সেখানে।প্রতিবিম্ব তো সেখানেও পড়ে।একটা মরিয়া প্রচেষ্টা ছায়া ধরার।পৌঁছোবার আগ পর্যন্ত প্রতিটা পদক্ষেপে প্রিয়াংশু বাবু টের পেলেন সেই অদৃশ্য অস্তিত্বের উপস্থিতি।ছায়ার মত, কিন্তু ছায়া নয়।দাঁতে দাঁত চেপে মনের সমস্ত শক্তি একত্র করে বাথরুমের দরজাটা খুলেই আয়নার দিকে চোখ রাখলেন, আর রেখেই আপনা থেকে বিস্ফারিত হয়ে যাওয়া চোখে অবিশ্বাসী দৃষ্টি ফুটে উঠল তাঁর, মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরোল একটা আর্তস্বর। আয়নাতে নিজের ছায়ার বদলে এটা কে? অন্য একটি কমবয়েসী ছেলের অবয়ব, কিন্তু ছেলেটা তাঁর ভীষণ চেনা।কোথায় দেখেছেন আগে স্মৃতি হাতড়াতে থাকেন।তার একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা তীক্ষ্ণ চাহনি অবশ করে ফেলে প্রিয়াংশুকে।সম্মোহিতের মত  থমকে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন করেন “কে …কে তুমি”? প্রতিবিম্ব মুচকি হাসে রহস্যময় ভঙ্গিতে।“চিনতে পারছনা? সব ভুলে গেছ এই ক’ বছরে?ভাল করে দেখো আরেকবার প্রিয়াংশু রায়!” আরেকবার তাকাতে বাধ্য হন তিনি অগত্যা, বাধ্য বললাম এই কারণে, যে প্রিয়াংশু রায় ভয় পেয়েছেন একটু।না, একটু না অনেকটাই।ছেলেটাকে আয়নার ভিতরেই দেখতেন তিনি,তবে আজ থেকে অন্তত বছর কুড়ি আগে।শূন্য বাড়িতে এই স্নানঘরের ছোট্ট পরিসরে আজ মুখোমুখি তিনি আর তাঁর অতীত।আচ্ছা ভূত মানেও তো অতীত?এই আসল কথাটা তাঁর মাথায় এখনো না আসায় নিজের প্রতিই অসন্তুষ্ট হলেন একটু। তার মানে ভূত মানুষের জীবিত অবস্থাতেও তৈরি হতে পারে? কেউ বেঁচে থাকতে নিজেই নিজের ভূতকে চাক্ষুষ করেছে এমন উদাহরণ মনে হয় নেই এ বিশ্বে।মনের মধ্যে সাইক্লোন ওঠার শব্দ টের পেলেন প্রিয়াংশু।তাঁর বিহ্বল অবস্থা কাটতে না কাটতেই ওপারের তরুণ প্রিয়াংশু বলে উঠল “সবার কাছে লুকানো যায় কিন্তু নিজের কাছ থেকে নিজে লুকানোর জায়গা কোথাও নেই যে এ দুনিয়ায় সেটা তোমার নিশ্চয়ই ভাল করেই জানা আছে? অকুতোভয় অসমসাহসী প্রবল যুক্তিবাদী প্রিয়াংশু রায় যে ছোটবেলায় একলা অন্ধকারে একটা আরশোলা দেখেও লাফিয়ে উঠত, ভূতের ভয়ে লোডশেডিং হলেই ‘রাম রাম রাম’বলে  উচ্চৈঃস্বরে চেঁচাত সে খবর আর এখন কে রাখে? যারা জানত তার মধ্যে তোমার মা বাবা,তাঁরা তো গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন হল আর বন্ধুরা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে এদিক ওদিক স্কুলের পর।তুমি এখন খানিকটা বিখ্যাত হয়েছ,তাদের সাথেও যোগাযোগ নেই। তার মানে তোমার এই একটা অন্ধকার দিক তুমি ছাড়া আর কারওরই জানা নেই তেমন।কিন্তু তার সুযোগে তুমি যে এইভাবে ভূতের অস্তিত্ববিরোধী  সব ভাষণ দিচ্ছ, সামান্য কয়েকটা বুজরুক কে ধরে প্রমাণ করতে চাইছ সত্যিকারের ভূত নেই, সেটা কি ঠিক? তোমার থেকে কি আর কেউ ভাল জানে তেনারা যে সত্যি বর্তমান?” এই অবধি বলে আয়নার ছেলেটা থামল একটু। প্রিয়াংশু কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না,অনেকদিন পর যেন একটা পুরনো ঘরের তালা খোলা হল,একরাশ ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে তার থেকে বেরিয়ে এলো সযত্নে লুকানো কিছু গোপন দলিল।ফ্ল্যাশব্যাকের মত মনে পড়ে গেল তাঁর বাইশ বছর আগের এক রাতের কথা। তখন  তিনি ক্লাস নাইন। টিউশন সেরে ফেরার সময় হঠাৎ লোডশেডিং। পাড়ারই সহপাঠী বন্ধু বাবলুর সাথে সাইকেলে বাড়ি অবধি মিনিট পনেরোর পথটা ফেরেন রোজ একসাথে।আর এমনই কপাল, সেদিনই বাবলুও অ্যাবসেন্ট। ভাদ্র মাস, কেমন যেন একটা গুমোট গরম, চারদিক থমথমে। সন্ধ্যে হবার আগে একঝাঁক কালো মেঘে আকাশ ঢাকা পড়ল।অন্ধকার রাস্তায় ফেরার সময় সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে কিছুটা এগোতেই বৃষ্টি শুরু হল টিপটিপ।মেঘ গর্জন করে আলো ঝলসে উঠল আকাশের প্রান্তসীমা বরাবর।এই রাস্তা টা এমনিতেই অন্ধকার থাকে দুপাশে লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দৈত্যাকার ঝাঁকড়া শিরীষ গাছগুলোর জন্য,আজ আরও বেশী মনে হচ্ছে যেন।আজ কি অমাবস্যা? হঠাৎ এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকে উঠল কাছেই কোথাও। কান ফাটানো শব্দটাও প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই।সাইকেলটা অন্ধকারে একবার পাক খেয়ে শূন্যে উঠে গেল। প্রিয়র খালি মনে হচ্ছে সাইকেলটা একটা কালো গুহার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। মাটির নীচে গভীর থেকে গভীরে।চাকার নীচে মাটির স্পর্শটাও পাচ্ছেনা আর।ভয়ে হাত পা অবশ হয়ে আসে প্রিয়র।সে নিজেকে ছেড়ে দেয় অদৃষ্টের হাতে। একটা ঝাঁকুনি খেয়ে টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঘন অন্ধকারে।সাইকেলটা ছিটকে পড়ে কোথাও একটা, হাঁটুতে বেশ জোরে লাগল।অন্ধের মত হাতড়াতে হাতড়াতে এগোতে থাকে সে হামাগুড়ি দিয়ে। নাকেমুখে মাকড়শার জাল জড়িয়ে যায়।আর ঠিক তখন যেন পাতাল থেকে উঠে আসা একটা নীলচে আলো ধোঁয়ার মত ঘিরে ফেলতে থাকে চারপাশ, সাথে একটা গুবগুব শব্দ জলস্রোত এগিয়ে আসার কোন প্রাচীন অতল থেকে। জোনাকির মত অথবা ঠিক জোনাকি নয় আরও তীক্ষ্ণ কয়েক জোড়া চোখ জ্বলে উঠতে থাকে চারপাশে তাকে ঘিরে। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতেও প্রচণ্ড অবাক হয়ে যায় প্রিয় এটা ভেবে যে সে কিভাবে এখনো বেঁচে আছে ভয়ে হার্টফেল না করে।মনে হয় ভয়ের চূড়ান্ত সীমা থাকে কোন একটা। সেটা পেরিয়ে গেলে আর ভয়ের অনুভূতিটা কাজ করেনা ঠিক।যেমন দেখা যায় ডাক্তারবাবুদের দেওয়া কড়া কড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে করে সাধারণ ওষুধে আর জ্বরজারি কমেনা আজকাল কারো।ধোঁয়া গুলো চোখের সামনে অবয়ব নেয়,সব গুলো একরকম,আরেকটু স্পষ্ট হলে দেখা গেল তারা সবাই প্রিয়রই প্রতিরূপ, ডুপ্লিকেট যাকে বলে! স্থির চোখে চেয়ে আছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। কি বলবে ভেবে পায়না প্রিয়। তো তো করে বলে “তো- তোমরা কারা? আমি কোথায়?” একটা কান ফাটানো অট্টহাসিতে কেঁপে ওঠে চারপাশ।৪-৫ জন একসাথে বলে ওঠে গমগমে স্বরে “ আমরা তোমার মনের মধ্যে জমে থাকা ভয়,ভীতি। প্রতি মুহূর্তে তুমি যে ভয় পাও,অন্ধকার কে, অদেখা কে,সরীসৃপ বা বিসদৃশ কোন প্রাণী কে,তাদের মিলিত রূপ হলাম আমরা। তুমি ভয়ের সামনাসামনি হতে চাওনা আসলে।আজ সামনে বাজ পড়ায় হাত আচমকা কেঁপে গিয়ে তোমার সাইকেলটা গড়িয়ে রাস্তার পাশের নয়ানজুলিতে পড়ে যাবার সময় সেই ভয়েই তোমার হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়েছে কিছুক্ষণের জন্য।তুমি এখন দুই দুনিয়ার মাঝের স্টপেজে।এখনো ওদিক থেকে সবুজ সিগন্যাল আসেনি।তোমার শরীর এখনো মৃত নয়। খাঁচার জানলার কাছে মুখ বাড়িয়ে আছে তোমার প্রাণপাখি।একমাত্র যদি তোমার মনের এই ভয় তোমায় ছেড়ে চলে যায়, তাহলে আবার ফিরে যেতে পারো চেনা পরিবেশে,মর্ত্যলোকে, পার্থিব শরীরে ভর করে। কিন্তু তোমার মধ্যে সে সাহস কি আছে?মনে তো হয়না” … “আছে আছে আছে!” চীৎকার করে উঠল সর্বশক্তি দিয়ে প্রিয়াংশু। বাঁচার অদম্য ইচ্ছায় যেন বেঁধে রাখা অনেক গুলো শিকল এক লহমায় ছিঁড়ে কেটে উঠে দাঁড়াল সে উত্তেজিত হয়ে।“তাহলে বলছ ভয় পাবে না আর? কিছুকেই?” —“না  আ আ আ! কক্ষনো না, কাউকেই না!আমি বাঁচতে চাই নির্ভীক ভাবে।কাউকে ডরাবোনা, কিচ্ছুকে না…” বলতে বলতে প্রিয় দেখতে পায় ছায়ামূর্তিগুলো কেমন যেন মোমের মত গলে গলে পড়ছে, মিশে যাচ্ছে ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় আবার। প্রবল উত্তেজনায় জ্ঞান হারায় সে।জ্ঞান ফিরে দেখল হাসপাতালের বেডে শুয়ে।কয়েক জায়গায় ব্যান্ডেজ। চারপাশে উদ্বিগ্ন প্রিয়জনদের মুখ।কিন্তু প্রিয়াংশু রায় সেদিন থেকেই অন্য মানুষে বদলে গেছিল।এক ঝটকায়।আর আজ এতদিন পর যেটা ঘটল সেটা আরেকটা বদল নিয়ে আসলো হয়তো। সব ঘটনা গুলো পরপর মনে পড়ে যাবার পর কপালের ঘাম মুছতে মুছতে প্রিয়াংশু রায় দেখলেন মুখোমুখি আয়নাতে অবিকল তাঁর পঁয়ত্রিশ বছরের চেহারার লোকটাই ঘাম মুছছে ভয় ভয় চোখে তাকিয়ে। চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকালেন আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন একটা। ফিরে এসেছে মূর্তিমান ছায়া যথাস্থানে। তবে তার সাথে আরেকটা জিনিসও ফিরে এসেছে নতুন করে। ভূতে বিশ্বাসটা।এবং এটা পার্মানেন্ট।কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক পড়ল যে।চোখেমুখে জল দিয়ে এসে আবার লেখার টেবিলে বসেন প্রিয়াংশু রায়। “ভূত খুব জটিল বস্তু।বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে সবসময় এর ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। তাই কোন থিয়োরি দিয়েই ভূতকে বর্ণনা করা যাবেনা। শুধু এটুকু বলে রাখি,ভয় থাক বা না থাক, ভূত ছিল, ভূত আছে, ভূত থাকবে”।……

[প্রকাশিত ঃ কিশোর ভারতীপত্রিকা,২০১৬]


বিপদ রঙের নেশা
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

তের বছরের জয়ন্ত একটু অন্তর্মুখী স্বভাবের। বন্ধুবান্ধব যে একেবারেই নেই তা নয় তবে খুব বেশী মেলামেশা করেনা কারোর সাথেই। খেলাধূলা করার চেয়ে কম্পিউটার আর মোবাইল ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতেই পছন্দ করে ঘরে বসে। নামী ইংরাজি মাধ্যম স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্র, পড়াশুনায় বেশ ভালই ছিল কিন্তু ইদানিং সে একটু অমনোযোগী হয়ে পড়েছে এমন অভিযোগে দুবার গার্জেন মিটিঙে তলব পড়েছে অনুরাধার, জয়ন্তর চাকুরীজীবী মা’র। অনুরাধা ডিভোর্সি, পাঁচ বছর বয়েস থেকে একাই বড় করছেন ছেলেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি একটু উদ্বেগে ফেলে দিয়েছে তাঁকে। হঠাৎ আচরণে বদল আসছে জনির(জয়ন্তর ডাকনাম), থেকে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখছে অনেকক্ষণ ধরে, জানতে চাইলে রুক্ষভাবে জবাব দিচ্ছে, – ‘ আমার privacy তে নাক গলাতে এসোনা। আমি আমার ঘরের দরজা বন্ধ রাখব কিনা সেটা আমার ইচ্ছা!’ বেশি কিছু বলতেও ভয় পান অনুরাধা। সারাদিন তো বাড়িও থাকেননা, কিজানি আবার…! একটু eccentric লাগছে ওকে কদিন থেকেই,এটা খেয়াল করেছেন তিনি। স্কুলের প্রিন্সিপালও জয়ন্তর রেজাল্টের চেয়েও ওর আচরণ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন সেটা জানিয়েছেন। অন্যমনস্কতা, খিটখিটে মেজাজ, চাহনিতে একটা ঘোলাটে ভাব ফুটে উঠছে যেন। ছোটবেলা থেকেই একটু সর্দি কাশির ধাত জনির, সেটাও যেন আরও বেড়ে গেছে সম্প্রতি। একদিন ইচ্ছে করেই অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন অনুরাধা। ছেলের ঘরের দরজা যথারীতি বন্ধ। – ‘ জনি দরজাটা খুলবি একটু?’ ডাকতেই ঘরের মধ্যে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ আর পরক্ষণেই পিছন দিকের কাঁচের জানলাটা দড়াম করে খোলার আওয়াজ। জড়ানো গলায় কিছু একটা বলল বটে কিন্তু সেটা শোনার জন্য দাঁড়ালেন না অনুরাধা। ঘরের পিছন দিকটায় বাড়ির সীমানার আগে সরু একটা প্যাসেজ আর বাথরুমের নিকাশী নালা। সুইপার ছাড়া ওদিকে কেউ খুব একটা যায়না, কি মনে হতে অনুরাধা ছুটে দরজা খুলে বেরিয়ে সেদিকেই গেলেন। জানলার নীচে পৌঁছতেই গলা থেকে একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল তাঁর। নর্দমা আটকে বোঝাই হয়ে পড়ে আছে একগাদা – ডেনড্রাইটের ফুরিয়ে যাওয়া টিউব। কিছু বুঝতে আর বাকি রইলনা তাঁর। টলতে টলতে এসে কোনোমতে ঘরে ঢুকেই দীর্ঘদিনের বন্ধু মনোবিদ ডঃ সুগত ঘোষকে ফোন করলেন। কাছেই বাড়ি, খানিকক্ষণের মধ্যেই তিনি চলে এলেন। তখনো জনির ঘরের দরজা খোলা, আধ ভেজানো। বিছানায় উপুড় হয়ে অর্ধচেতন দেহে শুয়ে আছে সে। দরজা জানলা বন্ধ করে কয়েকটা রুমালের মধ্যে ঐ তরল অ্যাডেসিভটা ঢেলে তার ঘ্রাণ নিয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত জনি। একটু ধাতস্থ হবার পরেও সুগত আঙ্কলের সামনে সে কথা বলতে চাইছিলনা কিছুতেই। মা চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করতে মাথা নিচু করে সব স্বীকার করল অবশেষে। স্কুল যাতায়াতের পথে রোজ উড়ালপুলের তলায় তার বয়েসি ছেলেদের জটলা দেখে কৌতূহলে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছিল সে একদিন। ছোটবেলা থেকে গ্রাস করা একাকীত্ব থেকে তার মনে এক ধরনের অবসাদ আর বেপরোয়াভাব জন্ম নিয়েছিল ধীরে ধীরে। তারই ফলে সে এই নেশায় নিছক কৌতূহল বশে জড়িয়ে পড়ে। সুগতবাবু বললেন, ‘এটা একটা ভয়ানক চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে দিনদিন। এ ধরনের আঠায় সীসা,লোহা,অ্যালুমিনিয়ামের মত ভারী ধাতু থাকে, যার প্রভাবে রক্তে অক্সিজেন প্রবাহ বাধা পায় , সে কারণেই বুকে কফ বসা, নাক চোখ মুখ জ্বালা করা এমনকি নাক দিয়ে রক্ত পড়া এসব উপসর্গ দেখা যায়। দীর্ঘদিন এর কবলে থাকলে প্রাণহানির আশঙ্কাও থাকে বৈকি!’ শুনেই আবার ডুকরে কেঁদে ওঠেন অনুরাধা। জনি নিশ্চুপ। আরও বলে চলেন ডঃ ঘোষ – ‘ আর মুশকিলটা হল অন্যান্য ড্রাগের মত এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাও অসম্ভব যেহেতু হার্ডওয়্যার ষ্টোরগুলোতে এটা একটা সহজলভ্য বস্তু আর দামও তথাকথিত মাদকদ্রব্যের তুলনায় বেশ কম। সে কারণেই পথশিশুদের মধ্যে এটার রমরমা বেড়েছে। এটা দিয়ে শুরু করে পরে আবার গাঁজা, কোকেন, হেরোইনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এদেরই অনেকে। জনি তোমাকে মায়ের মুখ চেয়ে একটা প্রতিজ্ঞা করতেই হবে আজ! আর কখনো এই সর্বনাশা রাস্তায় পা বাড়াবেনা। কি, শুনবে তো?’ জনি সম্মতিসূচক ঘাড় কাত করে একবার শুধু। -‘গুড। আজ তবে উঠি অনুরাধা। আশা করি এ ধরণের কোন ঘটনায় আমাকে আর আসতে হবেনা এখানে। ভাল হয়ে থেকো জনি’।

মাদকাসক্তির খারাপ দিকগুলো অল্প বয়েসের ছেলেমেয়েরা চট করে জানতে পারেনা বলে স্রেফ কৌতুহলের জেরে অনেকেই ধ্বংসের পথে পা বাড়ায়। জনির ক্ষেত্রেও সেটাই হল। সেদিন অত করে বোঝানো সত্ত্বেও কিছুদিন পর আবার তার আচার ব্যবহারে অস্বাভাবিকতা দেখা যেতে লাগল। অথচ তার বাড়ি থেকে বেরনো বারণ। ফাইনাল পরীক্ষার আগে পর্যন্ত বাড়িতে টিউটর রেখেই পড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন তার মা,স্কুলের সম্মতি নিয়েই। খবরের কাগজ, দুধওয়ালা আর পোস্টম্যান ছাড়া বাড়িতে কেউ আসেও না  বাইরের লোক। অথচ নেশা যে সে ছাড়তে পারেনি এটাও বোঝা যাচ্ছে। দরজা বন্ধই থাকছে আগের মত, মাঝেমাঝে গলা ফাটিয়ে হাসি আবার কখনো কান্নার শব্দ ভেসে আস্তে লাগল। একদিন খাবার টেবিলেও সে বিড়বিড় করছিল অস্বাভাবিক কিছু অসংলগ্ন কথা, ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে, -‘ লাল রঙের গন্ধটা খুব ভাল… খুব সুন্দর, খুব সুন্দর!’  -‘ কি বলছিস জনি? লাল রঙের গন্ধ? তোর কি হয়েছে রে?’

সাথে সাথে নিজেকে থামিয়ে ‘কিছু না’ বলে প্রায় না খেয়েই উঠে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দোর দিল সে। পরে সুযোগ পেয়ে একদিন জনির ঘরে লুকিয়ে তল্লাশি চালিয়েও কোন ডেনড্রাইটের টিউব বা সন্দেহজনক জিনিস পেলেন না অনুরাধা। রীতিমত অসহায় হয়ে আবার বন্ধু সুগতর শরনাপন্ন হলেন। – ‘ওর কি হয়েছে আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা। আমার ছেলেটা কি পাগল হয়ে গেল? এখনো ওর ঘরের দরজা বন্ধ, একা একা হাসছে, ডাকলেও সাড়া দিচ্ছেনা। ও কি আবার ভয়ানক কিছুর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে? তুমি দেখোনা যদি কিছু করতে পারা যায়, প্লিজ’?

-‘আচ্ছা দেখছি। এত চিন্তা করোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে’।

গাড়িটা নিয়ে পৌঁছতে আট দশ মিনিটের বেশি লাগলনা সুগতর। কিন্তু তিনি আসার আগেই যা হবার তা হয়ে গেল। যা হল তা ঠিক হলনা। বাড়ির সামনেটা লোকে লোকারণ্য দেখেই একটা কু গেয়ে উঠেছিল তাঁর মনে। কাছে যেতেই ধাক্কাটা লাগল বুকে। রক্তাক্ত নিথর দেহটা পড়ে আছে জনির, ওর ঘরের ভাঙ্গা কাঁচের জানলার ঠিক নীচে। অনুরাধা অজ্ঞান হয়ে গেছে। প্রতিবেশি আর বাড়ির কাজের লোকেরা সামলাচ্ছে তাকে। সুগত মাথা ঠাণ্ডা রেখে চটপট উপরে উঠে ঢুকলেন জনির ঘরে। যে জিনিসটা প্রথমেই তাঁর অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়ল একটু নজর করতেই, সেটা বেশ কয়েকটা চিঠির খোলা খাম, যেগুলোতে প্রেরকের ঠিকানা সব এক। ডাকটিকিটের জায়গাটা ছেঁড়া সবকটা খামের। সুগত বাবু চোখের সামনে ভাল করে ওটাকে তুলে ধরতেই স্ট্যাম্পের পিছনে লুকনো অংশে সাদা গুঁড়োটা চোখে পড়ল তাঁর।
LSD!  লাইসারজিক অ্যাসিড ডাইইথাইল মাইড,এক ধরণের হ্যালুসিনোজেন নারকোটিক পরিভাষায় । চিঠির খামে ডাকটিকিটের পিছনে লুকানো পুরিয়া। ড্রাগ পাচারের এক অভিনব আর অপেক্ষাকৃত নিরাপদ পদ্ধতি। ইন্টারনেট ঘেঁটে কোনোভাবে হয়তো সন্ধান পেয়েছিল জনি এই চক্রের। অন্তর্জালে অর্ডার পাঠাত ঘরে বসেই,তাই কেউ সন্দেহ করেনি ।নানারকম হ্যালুসিনেশন হয় LSD এর প্রভাবে। কল্পবাস্তবতার জগতে বিচরণ করতে থাকে আক্রান্ত ।  জনি শেষবার দেখেছিল সে উড়ছে ডানা মেলে। সামনে শুধু একটা লালচে রঙিন কাঁচের জানলা তখন, সেটার থেকে তখন লাল রঙের মিষ্টি একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। যেটা পেরোলেই বহু আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি। …

[প্রকাশিতঃ U TURN MAGAZINE, ২০১৬,বর্ধমান ক্যুইজ ক্লাব  আয়োজিত প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত]

প্রাণের ভাষা
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী
*********************

ছ’জন ভদ্রলোক হেঁটে যাচ্ছিলেন নিঝুম রাতে পাশাপাশি মহানগরীতে গঙ্গার ধার ধরে।প্রথম ভদ্রলোক, খর্বাকৃতি,মাথায় টাক,গায়ে একটা মামুলি চাদর জড়ানো,পরনে ধুতি আর একটা অদ্ভুত শুঁড়তোলা চটি, মুখ খুললেন প্রথমে – “দেখিলেন সবাই, কালে কালে আমার বর্ণপরিচয়ের ঈগলটাও ইগল হইয়া গেল। আমার বানান পড়িয়া এযাবৎকাল নাকি সব ভুল শিখিয়াছে”।
পাশের মাথায় শামলা আঁটা অভিজাত চেহারার পুরুষটি বেঁকা হেসে বললেন – “মহাশয়, আপনার পিতৃদত্ত নামটি যে অদ্যাবধি অক্ষত রহিয়াছে ইহাকেই পরম সৌভাগ্য বলিয়া ধরিয়া লওয়া সমীচীন হইবে সম্ভবতঃ।ওখানেও দীর্ঘ ঈ কার রহিয়াছে কিন্তু”।
তাঁর ঠিক পাশের সাধারন রোগা গড়নের শুভ্রকেশ সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা খালি পায়ে হাঁটতে থাকা ব্যক্তি মুখ খুললেন – “আরে রাখুন মশাই আপনার টেরা টেরা কথা। সামান্য একটা কথা কইবেন তার মধ্যেও শতেক অলঙ্কার আর তৎসম তদ্ভব শব্দ ঢুকাইতেছেন। ওই জন্যেই আপনাকে এই সময়ে কেহ আর পড়তে চাহেনা”।
সুপুরুষ দীর্ঘদেহী কালো জোব্বা পরা পাকা চুলদাড়ি ওয়ালা ভদ্রলোক হাঁহাঁ করে উঠলেন – “ওকি কথা চাটুজ্জে বাবু। পড়বে না কেন। অল্পস্বল্প হলেও কিছু লোক তো পড়বেই”।
বলেই আড়চোখে এক বার শামলা আঁটা ভদ্রলোকের দিকে চাইলেন। ইঙ্গিতটায় ব্যঙ্গ স্পষ্ট। আবার সেই শনিবারের চিঠির দিন গুলোর মত বা নব্য হিন্দু-ব্রাহ্মসমাজ নিয়ে মতবিরোধের মত তরজা না শুরু হয়ে যায় তাই জলদি প্রসঙ্গ পাল্টে আবার সেই রোগা ভদ্রলোকের দিকে ফিরে বললেন – “তাছাড়া আপনি এত গুরুচণ্ডালী ব্যবহার করেন কেন বলুন তো”।
তিনি তো চটে লাল।- “ওহ আপনি তো আবার দুনিয়াশুদ্ধু লোকের দোষ গুণ বিচারের দায় নিয়াছেন, বাঙ্গালীকে শিক্ষিত করিবেন। কাহাদের? যাহারা আপনার সবেধন নীলমণি নোবেলটাও … তা জানিয়া রাখুন, ওই দোষ টোষ থাকলেও আমার লেখার কাটতি এখনো যথেষ্ট। এক দেবদাসকে নিয়েই কতগুলো ছবি হয় এখনো ফি বছর দেখেন না”?
সুদর্শন দীর্ঘদেহী মুখে পাইপ, স্যুটেড বুটেড সাহেবসুলভ পঞ্চমজন ফোঁস করে উঠলেন – “ছবি? ওগুলোর নাম ছবি? বাংলা সাহিত্য নিয়ে ছবি তো আমিও করেছি, তা সে পথের পাঁচালী দেখেও লেখক স্বয়ং নাকি খুব খুশি হননি, আর আপনার দেবদাসকে নিয়ে এরা যা ছেলেখেলা শুরু করেছে, আপনি সহ্য করতে পারতেন? আর লেখার কথা বলতে গেলে, আমার ফেলু বা শঙ্কু কিন্তু এখনো বাজার মাত করে রেখেছে, বইপড়ার এই আকালেও”।
সিগারেটে সুখটান দিয়ে শেষোক্তজন, এক মাথা কাঁচাপাকা চুল, চোখে চশমা, গায়ে টুকটুকে লোহিত পাঞ্জাবী আর চোখে নীল আকাশের স্নিগ্ধতামাখা, বলে উঠলেন শান্ত স্বরে – “কিন্তু রায়বাবু,আপনার ফেলু মিত্তিরকেও যে আজকাল ইংরেজি অনুবাদেই ছেলেমেয়েরা পড়ছে এই খাস কলকাতায় বসেও, সে খবর রাখেন তো? বাংলা ভাষায় বই আদৌ পড়ে কজন বলুন তো”?
শুনে তিনি পাইপটা দাঁতে চেপে ধরে ঈষৎ ভুরু কুঁচকে বললেন – “হ্যাঁ খবর রাখি বই কি। এটাও শুনলাম সম্প্রতি আপনার কবিতাও সাম্রাজ্যবাদের অভিযোগে দুষ্ট হয়ে বাদ পড়েছে ওপার বাংলার পাঠ্যসূচীতে।সাঁকোটা দুলতে দুলতে শেষে জলেই পড়ে গেল যে। আর শুধু কি আপনি? ওই উনিও তো ছাড় পেলেন না। ভাবুন যে দেশের জাতীয় সঙ্গীতটাও ওনার লেখা সেখানেও…”
‘উনি’ তখন মাথা নিচু করে জোব্বার পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে নীরব হয়ে চলতে চলতে শেষ কথাগুলোর জবাব না দিয়ে শুধু ভাবালুকণ্ঠে বললেন – “তাহলে কি আমাদের লেখা আর পড়বে না কেউ? ’আজি হতে শতবর্ষ পরে’ শুধু কতগুলো নাম হয়েই রয়ে যাব ইতিহাসের পাতায়”?
লাল পাঞ্জাবী বলে উঠলেন – “দুঃখ করে লাভ নেই বুঝলেন, এই প্রজন্ম যেভাবে দৌড়চ্ছে তাতে ওদের দোষ না ধরাই ভাল। আমার তো মনে হয় এই ইন্টারনেট আর বিশ্বায়নের যুগে ইংরাজী ভাষাটা শুধু আমাদের না সব ভাষাকেই কব্জা করে ফেলছে একটু একটু করে”।
মাথায় খাটো ব্যক্তিত্বে পর্বতপ্রমাণ ব্যক্তিটি হাহাকার করে ওঠেন – “অতঃপর উপায়? আমাদের সন্ততিরা বাংলাসাহিত্য পড়িবে না? আমি তো শেক্সপিয়ার সায়েবের লেখাও বাংলায় বদলাইয়া লিখিয়াছিলাম সকলের জন্য। আর এখন বাংলার লেখকদিগের লেখাই ইংরেজীতে পড়িতেছে ?”
ছ’ফুট চার ইঞ্চির দীর্ঘদেহী পাইপ নামিয়ে বললেন – “পড়বে। তবে ভাবনাচিন্তা বদলাতে হবে। ধরুন ভাষাটা বাংলাই রইল তবে হরফ গুলো রোমান হল, তাহলে হয়ত অনেকের সুবিধা হবে। এস এম এস তো সবাই ওভাবেই পাঠায় শুনি”।
এতক্ষণ চুপ থেকে আর পেরে না উঠে শামলা আঁটা ভদ্রলোক বলে উঠলেন – “তোমাদিগের বাক্যালাপ যাহা কিছু শ্রবণগোচর হইতেছে তাহার কিয়দংশ বুঝিতে পারিলেও অধিকাংশই অজ্ঞাত ঠেকিতেছে”।
অগত্যা সেই দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকই শেষ কথাটা বললেন – “দেখুন সবাই, সবটা যে সবাই বুঝতে পারবই এমন তো নয়। আসল ব্যপারটা হল সময়; সময়ই সবচেয়ে বড় কারিগর। তার হাতেই থাকে প্রবাহের ভার। এই ভাষা তো বদলাচ্ছে সেই আদিকাল থেকেই। আমিও বদলেছি দেখুন না। দিন যাচ্ছে, ভাষার বয়েস বাড়ছে, ভার বাড়ছে। ছোট শিশু অ-আ দিয়ে শেখা শুরু করে তারপর তো খই ফোটাবেই কালক্রমে। আমাদের সময় থেকে ভাষাটা সাবালকত্ব পেতে শুরু করেছিল। এখন তো আমরা আর নেই। অভিভাবক যারা আছেন, সন্তানের বয়ে যাওয়া আর মানুষ হওয়ার দায়টা তারাই নিন না হয়। আমি বলি কি, আগে ভাগেই এতটা হতাশ না হওয়াই ভাল। চলুন সবাই,ভোর হয়ে এল”।
ছায়ামূর্তিগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পশ্চিমাকাশের দিকে। ভোরের শুকতারা নতুন আশা নিয়ে তখন উঁকি মারছে পূবদিগন্তে।

(www.kobitaclub.com -এ প্রকাশিত, ২১শে ফেব্রুয়ারী,২০১৭)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s